সোমবার, ২ মে, ২০২২

রমজানে মী-টাইম, উই-টাইম বের করা খুব টাফ ছিলো। রমজানের একটা ব্যস্ততা তো থাকেই তার সাথে সাথে সবার অফিসের কাজের চাপ। সবমিলিয়ে আমরা একসাথে থাকলেও ছিলাম না থাকার মতোই। রোজ দেখা হতো, ইফতারে টুকটাক আলাপ হতো কিন্তু জম্পেশ গল্প হতো না। যেটাকে সবাই খুব মিস করছিলাম। 

বাইশ রমজানে আমার স্কুল ছুটি হলো, ছোটোদের স্কুল-কলেজ সাথে ভাইয়াদের অফিসও। একটা ভ্যাকেশন আসলো। প্রতিটা মুহুর্ত কাটালাম একসাথে।  আমরা ছোটো থেকেই একজন আরেকজনের পছন্দকে প্রাধান্য দেই। সেই মোতাবেক একসাথে দল বেঁধে কেনাকাটা করেছি। ঘুরেছি। রাতের শহর দেখেছি। মানুষের আনন্দ দেখেছি। উদযাপনের প্রস্তুতি দেখেছি। একরাশ উৎসব যেন মৌ-মৌ করে ঘিরে ধরেছে আমাদের। আমরা সব ভাই-বোনরা যখন খুব আনন্দে থাকি, জড়াজড়ি করে থাকি বড়োআম্মুদের চোখেমুখে খুশির ফোয়ারা দেখতে পাই। আমাদের আনন্দই যেনো উনাদের তৃপ্তি।

আমরা গল্প করি রেনডমলি। টং এর দোকানে বসে চায়ের কাপে যেভাবে মুরব্বিয়ানরা ঝড় তুলে রাজনৈতিক আলাপ থেকে শুরু করে ক্রিকেট, ক্রিকেট থেকে শুরু করে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি নিয়ে, আমাদের আড্ডাটাও খানিকটা তেমন। আমরা বলি, পৃথিবীর সব আড্ডাই যে শিক্ষণীয় হতে হবে তার কোনো মানে হয় না। আমরা খোশমেজাজে হেসেখেলে কথা বলি, কথা শুনি। আমরা একসাথে সময় কাটাচ্ছি, নিজেদের ভাগ করে নিচ্ছি আমাদের কাছে এটাই ইম্পরট্যান্ট। পয়েন্ট টু বি নোটেট আমরা একা না, আমরা একসাথে আছি। ইটস এ্যা আলটিমেট ম্যাজিক্যাল থিঙক আমাদের কাছে।  

তারাবির পর, গত পরশুরাতে সবাই একসাথে নুহাশ হুমায়ুনের 'পেট কাটা— ষ' সিরিজটা দেখলাম। কি দারুন কনসেপ্ট! কি দারুন এক্সিকিউশন! এটা দেখার বিশেষ কারন গল্পগুলো একেবারেই আমাদের। আমাদের চিরচেনা মিথের গল্প। আমাদের শৈশবের গল্প।আমাদের শেকড়ের গল্প। যে গল্পগুলোর সাথে মিশে আছে আমাদের মায়েরা, আমাদের দাদিরা। এমন একটা হরর সিরিজ সব ভাই-বোন একসাথে বসে দেখাটাই হ্যাপীনেস ছিলো আমাদের কাছে। 

আজ চাঁনরাত। এই রাতে বেসিক্যালি আমরা ঘুমাই না। কেউ ঘুণাক্ষরে ঘুমালেও নানা যন্ত্রনায় জোর করে তাকে জাগিয়ে রাখা হয়। এসব মিষ্টি অত্যাচার ভালোবাসার, মায়ার, একসাথে জেগে থাকার, স্মৃতিভান্ডার মজবুত করার। সারারাত একেক টপিকে খোশগল্পে মেতে থাকি। প্রতিটা রুমে মানুষে মানুষে গিজগিজ করে। সব আপনা মানুষ। সবাই সবার কথা ভাগাভাগি করে। টিভি দেখে। নিউজ দেখে। লো সাউন্ডে বাজতে থাকে আপামর বাঙালির মননে গেঁথে যাওয়া সেই গান— ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ, তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানী তাগিদ। চাঁনরাতে সবচে গুরুত্বপূর্ণ ডিপার্টমেন্ট রন্ধনশালা। এটা থাকে সবচে জমজমাট। সমানে মশলাপাতির প্রস্তুতি চলে, মায়েরা কালকের জন্য কি করবে না করবে তার জন্য ছোটো ছোটো সভারও আয়োজন করেন। রন্ধনশালার রাজত্ব একেবারেই উনাদের হাতে। পাঁচফোড়ন হয়ে আমাদের প্রবেশ করবার কোনো জো নেই। 

অন্যদিকে, আমরা এত্তোগুলা ভাই-বোন ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকি না। ছোটো থেকেই জড়াজড়ি করে থাকাটাই আমাদের অভ্যাস। এক বিছানায় শুয়ে বসে কাটিয়ে দেই। সত্যি বলতে এমন চাঁনরাত উদযাপনই— আমাদের ঈদ, আমাদের আনন্দ। আমরা এখনো বড়ো হইনি, বুড়ো হইনি। ঈদ আমাদের কাছে এখনো আনন্দের। আমাদের মধ্যে  ঈদের আনন্দ এখনো নিরানন্দ হয়ে আসে নি। সেই ছোটোবেলার মতো একই আগ্রহ কাজ করে। আমরা এখনো দুরন্ত। আমরা এখনো উল্লাসপ্রিয়। আমাদের শৈশব এখনো প্রাণবন্ত, জীবিত। মাঝেমধ্যে আমরা একজন আরেকজনের মুখের দিকে তাকিয়ে বলি— হাউ লাকি উই অ্যার! 

ঈদ মুবারক। 
দুই । পাঁচ । দুই হাজার বাইশ ।

মঙ্গলবার, ১ মার্চ, ২০২২

শবে মে'রাজের রাত নিয়ে ইবাদত বন্দেগির পাশাপাশি কিছু কৃষ্টি কালচারও আমাদের পরিবারে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। আমাদের ছোটোবেলা থেকেই আমরা দেখে আসছি শবে মে'রাজ আসবে আসবে সময় থেকেই আমাদের পরিবারে একটা পবিত্রতার শীতল হাওয়া বইতে থাকে। ছোটো থেকে বড়ো সব সদস্যদের অন্তরালে শবে মে'রাজ উদ্‌যাপনের ব্যাপক তোড়জোড় চলতে দেখি। আমরা বছরে নির্দিষ্ট কয়েকটা দিন সর্বোচ্চ ভালো পোশাক পড়ার চেষ্টা করি, তারমধ্যে শবে মে'রাজের রাত একটি। সবচে ভালো জামাটা ধুয়ে আম্মা নতুনের মতো করে রাখতেন আর আমরা সেটি পড়ে নামাজ পড়তাম। 

শবে মে'রাজের দিন সকাল থেকেই বাসায় একটা সেলিব্রেশনের আমেজ ক্রিয়েট হয়। যে বছর যতটুকু সামর্থ্য হয় ঠিক ততটুকু দিয়েই ভালো-মন্দ খাবার দাবারের আয়োজন করা হয়। শবে মে'রাজ যে খুউব বিশেষ এটি আমরা ছোটো বয়স থেকেই পরিবারের উদ্‌যাপনের আমেজ দেখে বুঝতে পারতাম। 

সব শবে মে'রাজের রাতেই— এশারের পর নফল নামাজ আদায় শেষে, আমরা সবাই গোল করে বসি। বাড়ির বাচ্চারা একে একে নাতে মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাঠ করে। চারিদিক থেকে মারহাবা মারহাবা বলে— আমরা তাদের উৎসাহ বাড়িয়ে দেই। তারপর পরিবারের সবচে বয়োজ্যেষ্ঠ কেউ— মে'রাজ গমনের বর্ণনা করে। প্রায় দেড়/দুই ঘন্টা ধরে চলে এই আলোচনা। প্রতিবছর একই ঘটনা, একই বর্ণনা কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন ভোকালে আমরা আমাদের মতো করে নতুনভাবে এটার স্বাদ গ্রহণ করি। এখন অবশ্য মাঝেমধ্যে আমাকেও সুযোগ দেয় কিছু বলতে। যার জন্য আমি বিশেষ প্রস্তুতিও নিয়ে রাখি। আলোচনার ফাঁকফুকুরে শ্রোতাদের মুখের দিকে তাকাই, আর দেখি— আমি যতই মে'রাজ গমনের বর্ণানার দিকে আগাই তাদের চোখমুখ ততই রোমাঞ্চিত হয় ওঠে।  

স্বভাবত আমরা আমাদের বিশেষ দিনগুলা পরিবার নিয়ে আষ্ঠেপৃষ্টে জড়াজড়ি করে উদযাপন করি। মুরব্বী কিসিমের সদস্যরা তাদের শৈশবের মে'রাজ কেমন ছিলো, গ্রামকেন্দ্রিক মে'রাজ কিভাবে উদ্‌যাপন হয় এসব স্মৃতি অনর্গলভাবে আওরাতে থাকেন। সেহেরির কিছু আগে— পাড়ার মসজিদ থেকে ইমাম সাহেবের সুরেলা কন্ঠে ভেসে আসে, "আসমানোহি পর সব নবী রাহ গেয়ে, আরশ আযমপে পৌঁহছা হামারা নবী...........ছবছে আওলা ও আলা, হামারা নবী, ছবছে বালা ও আলা, হামারা নবী" আমরা সবে সুরে সুর মিলাই। গাইতে থাকি। 

এভাবেই আমরা হৈ-হৈ রৈ-রৈ করে মে'রাজ উদ্‌যাপন করি। সারারাত জেগে থাকি। আমার এতটুকু বয়সে আমি কোনোদিন একটা নিরানন্দ মে'রাজের রাত দেখিনি। ছোটোবেলা থেকে দেখে আসছি, আমাদের মে'রাজ রজনী খুব উৎসবমুখর। আলোকিত। জ্বলমলে। আজ-ও আমরা খুব দরদ নিয়ে এই দিনগুলা উদ্‌যাপন করি, আয়োজন করি। আমাদের এই দিনের, এই রাতের সেলিব্রেশন নিয়ে বিশেষ এক 'আল্লাদ' আছে। 

১ মার্চ, ২০২২ইং। 
শবে মে'রাজ রজনী।

শনিবার, ১ জানুয়ারি, ২০২২

রোজনামা— ০১

একটা বছর যায় আর— আমি ক্রমশ পৃথিবীর আদিমতম কেউ হয়ে উঠি। আমার সাথে সাথে একটা ঐতিহ্য, একটা ইতিহাস বাড়তে থাকে— বৃদ্ধ হয়। দিস্তা-দিস্তা নতুন সংযোজন হতে থাকে। পুরোনো অনেক কিছুকে গলা টিপে হত্যা করা হয়। 
একটা মফস্বল হারিয়ে ফেলে তার নিজের গতিপথ। একা— এক সময় স-ব পুরোনো মিলিয়ে যায় বাতাসের সাথে। সেই—সব কিছুর রাজসাক্ষী হয়ে বেড়ে উঠছি আমি। আমার আগামীর কাছে— আমি আদিম মানুষে রুপ নিচ্ছি।

দুই হাজার-কুড়িতে যেই শূন্যতা আমাকে পেয়ে বসেছে— সেই শূন্যতা কোনো বছরের পূর্ণতা দিয়ে পূরণ করা সম্ভব না। শূন্যতা শূন্যতাই। বেদনার যেমন কোনো রঙ হয় না—শূন্যতারও না। তবুও— সব কিছু ছাপিয়ে বলতে হয়, একুশ আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে— বরঞ্চ, দু'হাত ভরে দিয়েছে। সবচে বড়ো কথা একুশ আমাকে আচমকা বড়ো করেছে। আম্মার বিয়োগে— ঘরের ছাদ ফুড়ে আকাশ স্পর্শ করার মতোন বড়ো করেছে। 

একুশের এই যাত্রায়— অনেকের সাথে আলাপ হয়েছে, কাজ হয়েছে। অজস্র পরিপূর্ণতা আমাকে ছুঁয়েছে। কৃতজ্ঞতায় আমার রুহ গলে যায়— গদগদ হয়ে ওঠে।

দিনশেষে আমিও কাঠগড়ায়। দীর্ঘতম শ্বাস নিয়ে বলতে হয়— মানুষ তো! গালগল্পে— নিজেকে মাটির মানুষ হিসাবে চর্চা করতে করতে, চোখ তো কখনো কখনো অহংবোধের সাথে কথার ফুলঝুরি ছিটায়। আমার করা সেইসব অহংবোধ— যদি কারোর কোনো দুঃখের কারন হয়ে থাকে; তবে ক্ষমা চাই। 

'বাইশ' আমার জীবনে একুশের মতোই হুল্লোড়ে থাকুক। পূর্ণতায় থাকুক। মায়াতে থাকুক। আমার প্রতিটা নতুন বছর যেনো কেবল সংখ্যা বদলে আসে— একুশের আদলেই। এটাই চাওয়া। আপনারা  আমাকে মঙ্গল কামনায় রাখবেন। 

উঠোন জুড়ে মিঠাদুপুর— ভাবি; আমার— এখনো কত সকাল দেখা বাকি, এখনো কত রাত নামে নি। এখনো কত দুঃখ ছোঁয় নি আমায়, এখনো কত সুখের তৃপ্তি— অনাদায়ী। 

সবাই কে নতুন বছরের শুভেচ্ছা। অনেক অনেক শুভেচ্ছা। 
ফজরে মুয়াজ্জিনের দরদমাখা কন্ঠ, অলসদুপুর, ট্রাফিকজ্যাম, মাগরিবের নীরবতা— সব কিছু ছুঁয়ে যাক আপনাকে; আমাকে। যা কিছু ভুল— ভুলে যান। নতুন করে মরমি মোলাকাত দিয়ে শুরু করেন পুরানো ধাঁচের নতুন হালখাতা। 🌿

শুক্রবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২১

চোখের— সামান্য সুখের জন্য কয়েক মুহূর্ত আগুন উড়ানোর উৎসব চলছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়োগ করে কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা করার পরও আমরা ব্যর্থ— শব্দবাজির দাপটের কাছে। 
নিয়মমাফিক, অনিয়ম 'বরদাস্ত' করা দিয়েই শুরু হয় আমাদের প্রতিটা বছর। আমরা কেবল সহনশীল জাতি প্রমাণর্থে দাবিয়ে রাখি— আমাদের রুহের ভেতরকার আলাপকে। হায়! রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরি? রাত পোহাবার আর কত দেরি পাঞ্জেরি? 

এক । এক । বাইশ ।

বৃহস্পতিবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২১

বই: বিশ্বনবী। 
লেখক: গোলাম মোস্তফা।
প্রকাশনী: আহমদ পাবলিশিং হাউস।
প্রকাশক: মেজবাহউদ্দীন আহমদ।
প্রচ্ছদ: আমানউল্লাহ।
বর্ণবিন্যাস: ইয়াশা কম্পিউটার।
প্রথম সংস্করণ: অক্টোবর ১৯৪২
মুদ্রিত মূল্য: ৪০০ টাকা মাত্র
পৃষ্ঠা: ৪৭২


_______________________________

একই জীবন, একই কাহিনী, একই চিন্তা, একই কর্মধারা। সে একই কথা—বহুমুখে, বহুজনে, বহুশতাব্দী ধরে বাতাসে-বাতাসে ফিরছে, তবু যেন অফুরান—যেন কিছু লেখা হলো আর অলিখিত রয়ে গেল ঢের। কিছু বলা হলো আর অনেক কিছুই হয়নি বলা। এ চর্চাক্ষেত্র বারবার কেন জানি অপূর্ণ রয়ে যায়। এ যেন রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্পের মত শেষ হইয়াও হইলো না শেষ—

এ যাবৎ অবধি— মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে অসংখ্য জীবনীগ্রন্থ লেখা হয়েছে। একেবারে প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে এই পর্যন্ত বহুলেখক, সাহিত্যবিশারদ, গবেষক এবং অনেক কবিদের হাতে হয়েছে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহান জীবনের চর্চা। এই চর্চা কখনো হয়েছে আরবী ভাষায় আবার কখনো অনারব ভাষায়ও। উর্দু ভাষায়, ফার্সি ভাষায়, আরবি ভাষায় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবনীগ্রন্থের অভাব নেই। তবে সেই তুলনায় আমাদের বাংলা ভাষায় এর ব্যাপকতা খুবই কম। 

বাংলা সাহিত্যে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে প্রথম গ্রন্থ রচনা করেন শেখ আবদুর রহীম। তারপর তাঁর সিরাত নিয়ে রচনা করার কাতারে এসেছে আরো বহুনাম, আরো বহুসাহিত্যিক। তারমধ্য কবি 'গোলাম মোস্তফা' একজন। তার সৃষ্টি 'বিশ্বনবী'। তাঁর  সীরাত সাহিত্যের এই 'সৃষ্টির' পরতে পরতে শিহরণ ও ছত্রে ছত্রে সাহিত্যরসের হিমশীতল সমীরণ। ভাষার মাধুর্য, মুগ্ধকর বর্ণনা, সুনিপুণ উপস্থাপনা, মননশীল শৈলী ও চিত্রায়ন—গ্রন্থটিকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।

আমার মনে পড়ে, ছেলেবেলায় কবি 'গোলাম মোস্তফা'র প্রার্থনা কবিতা দিয়ে তাঁর সাথে আমার প্রথম পরিচয়ের কথা।  
কবিতায় তিনি বলেছেন—
"দ্যুলোক-ভূলোক সবারে ছাড়িয়া
তোমারি চরণে পড়ি লুটাইয়া
তোমারি সকাশে যাচি হে শকতি
তোমারি করুণাকামী"
সেই ছেলেবেলায়—সেই প্রাথমিকে, কি নিদারুণ শব্দে তিনি আমাদের রবকে চিনিয়েছেন।
প্রার্থনা কবিতা দিয়ে শুরু হলেও তারপর গোলাম মোস্তাফার সৃষ্টির সবকিছুই কমবেশি পড়ার চেষ্টা করেছি। সাম্প্রতিক সময়ে পড়লাম তাঁর রচিত জীবনীগ্রন্থ 'বিশ্বনবী'। আজ সেই গ্রন্থটি নিয়েই আলাপ করবো, ইনশাআল্লাহ। 

১৯৪২ সালে চুঁচুড়া থেকে কবি গোলাম মোস্তফা রচিত ‘বিশ্বনবী’ প্রকাশিত হয়। গোলাম মোস্তফা (জন্ম: ১৮৯৭ - মৃত্যু: ১৩ অক্টোবর ১৯৬৪), একজন বাঙালি লেখক এবং কবি। তাঁর কাব্যের মূল বিষয় ছিল ইসলাম ও প্রেম। মুসলিম জাগরণের অগ্রদূত কবি গোলাম মোস্তফার অবদান বাংলা সাহিত্যে এক বিরল দৃষ্টান্ত। তাঁর রচিত ‘বিশ্বনবী’ একটি আশ্চর্য রকমের সফল সৃষ্টি। এই অমর গ্রন্থখানি গদ্যে রচিত হলেও সে গদ্যও—কবিতার মত ছন্দময় এবং মধুর। গ্রন্থখানা বিশ্বনবী হয়রত মুহম্মদ এর একটি সার্থক জীবন চরিত। গ্রন্থটিতে হৃদয়ের আবেগ, আন্তরিক অনুভূতি যে ভাবে বর্ণিত হয়েছে তার তুলনা আমাদের বাংলা সাহিত্যে নিতান্তই বিরল।
আমি মনে করি, এই বইটাকে শুধু একটা জীবনীগ্রন্থ বললে ভুল হলা হবে। কারন, এর দার্শনিক বিবৃতিকে অস্বীকার করবার জো নেই। নবীজীর জীবনের বিভিন্ন দিক পয়েন্ট বাই পয়েন্ট ধরে আমার মনে হয়না আগে কেউ এভাবে আলোচনা করেছেন। বইটির প্রথম খন্ডে মোট ৫৮টি ও দ্বিতীয় খন্ডে মোট ১৪ টি পরিচ্ছেদে আলোচনা করা হয়েছে। প্রতিটি পরিচ্ছেদের আলোচনা অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত, হৃদয়গ্রাহী ও প্রাঞ্জল। শব্দের সাথে শব্দের সখ্যতা, সাবলীল উপস্থাপন, বাক্যালাপের সুনিপুণ গাঁথুনি—সব মিলিয়ে আদ্যপ্রান্ত গ্রন্থটিই আমার অন্তরের খুব কাছের। আমার প্রিয় পাঠের সর্বোচ্চ চূড়ায় থাকবে এই গ্রন্থটির নাম।
তবে মনে রাখতে হবে, 'বিশ্বনবী' নিঃসন্দেহে একটি গবেষণাগ্রন্থ, সর্বসাধারণের বোধগম্যও। এর কোন আলোচনা যুক্তির ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়েনি, আবার আবেগের বশবর্তী হয়ে কোন অযৌক্তিক কিছুকে প্রশ্রয়ও দেয়া হয়নি। 

গ্রন্থটি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত অথচ মোটাদাগে একটা ধারণা পেতে পারেন—সেই সুবাদে নিম্নে সূচিপত্রটি উল্লেখ করলাম। 

সূচিপত্র—

প্রথম খণ্ড
* আমিনার কোলে
* কোন আলোকে
* প্রতিশ্রুতি পয়গম্বর
* বংশ পরিচয়
* নামকরণ
* সমসাময়িক পৃথিবী
* শিশুনবী
* প্রকৃতির কোলে
* বক্ষ-বিদারণ
* শিশুনবী এতিম হইলেন
* সিরিয়া ভ্রমণ
* আল-আমিন
* শাদী মুবারক
* কাবাগৃহের সংস্কার
* গৃহীর বেশে
* সত্যের প্রথম প্রকাশ
* সত্যের স্বরূপ
* সত্য প্রচারের আদেশ
* সত্যের প্রথম প্রচার
* প্রথম তিন বৎসর
* সংঘর্ষের সূচনা
* উৎপীড়ন
* এ আগুন ছড়িয়ে গেল সবখানে
* প্রতিক্রিয়া আরম্ভ হইল
* সাহারাতে ‘ফুটলরে ফুল’
* অন্তরীণ বেশে
* সর্বহারা
* তায়েফ গমন
* আল মি’রাজ
* অন্ধকারের অন্তরালে
* হিযরতের পূর্বাভাস
* শিষ্যদিগের প্রস্থান
* হিযরত
* আল-মদিনায়
* প্রেমের বন্ধন
* ইসলামিক রাষ্ট্র রচনা
* মদিনার আকাশে কালো মেঘ
* বদর-যুদ্ধ
* বদর-যুদ্ধের পরে
* ওহদ যুদ্ধ
* জয় না পরাজয়
* ওহদ যুদ্ধের শেষে
* চতুর্থ ও পঞ্চম হিযরীর কয়েকটি ঘটনা
* আয়েশার চরিত্রে কলঙ্ক-দান
* খন্দক যুদ্ধ
* ষষ্ঠ হিযরীর কয়েকটি ঘটনা
* হোদায়বিয়ার সন্ধি
* দিকে দিকে গেল আহবান
* খায়বার বিজয়
* মুলতবী হজ
* মুতা-অভিযান
* মক্কা বিজয়
* মক্কা-বিজয়ের পরে
* হোনায়েন ও তায়েফ অভিযান
* তাবুক অভিযান ও অন্যান্য ঘটনা
* বিদায় হজ
* পরপারের আহবান
* শেষ কথা

দ্বিতীয় খণ্ড
* পূ্র্বাভাষ
* হযরত মুহাম্মদ জন্ম তারিখ কবে
* কাবা শরীফ কখন নির্মিত হইয়াছিল
* ইসলাম ও পৌত্তলিকতা
* ইসলাম ও মো’জেজা
* স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক
* বিজ্ঞান আজ কোন পথে
* ইসলাম ও নূতন বিজ্ঞান
* মি’রাজ
* থিওসফী ও মি’রাজ
* ‘মুহম্মদ’ ও ‘আহমদ’ নাম কি সার্থক হইয়াছে
* মুহম্মদ ‘মুহম্মদ’ ছিলেন কিনা
* হযরতের বহু বিবাহের তাৎপর্য
* মুহম্মদ ‘আহ্‌মদ’ ছিলেন কি-না

সত্যি বলতে—মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি তাঁর অগাধ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসাই বইটিকে অসাধারণ জনপ্রিয় করে তুলেছে। 'বিশ্বনবী' সম্বন্ধে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর অভিমত— “মৌলভী গোলাম মোস্তফা কবিররূপে সুপরিচিত। তাঁহার নব অবদান ‘বিশ্বনবী'। বলা বাহুল্য, ইহা ‘বিশ্বনবী হযরত মুহম্মদের (সঃ) একটি সুচিন্তিত প্রায় ৫০০ পৃষ্ঠাব্যাপী জীবনচরিত। এই গ্রন্থকার আঁ-হযরত সম্বন্ধে তাঁহার দীর্ঘকালের গভীর চিন্তা ও গবেষণার সুষ্ঠু পরিচয় দিয়াছেন। আমরা এই পুস্তকখানিতে গোলাম মোস্তফা সাহেবকে একজন মোস্তফা-ভক্ত দার্শনিক ও ভাবুকরূপে পাইয়া বিস্মিত ও মুগ্ধ হইয়াছি । ভাষা, তথ্য ও দার্শনিকতার দিক হইতে গ্রন্থখানি অতুলনীয় হইয়াছে।”
অন্যদিকে, শ‍্রী মনোজ বসু বলেছেন— “মহানবীর পরমাশ্চর্য বৃত্তান্ত লেখার সময় আপনার কবি ধর্ম সর্বদা আপনাকে গণ্ডিসংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে রেখেছে। আমি ও আমার মত আরও অনেকে ধর্মে মুসলমান না হয়েও হযরতকে একান্ত আপনার বলে অনুভব করতে পেরেছি। ভাষা, কবিত্বঝঙ্কার ও ভাব—লালিত‍্যে বইটি অপরূপ মহিমা লাভ করেছে।”
আবার, ফুরফুরা শরীফের পীর মাওলানা আবু নসর মুহম্মদ বলেন—“যাঁহারা বাংলা ভাষায় হযরত রসূলে করীমের (সঃ) সঠিক জীবনী ও সত‍্যরূপ জানিতে চান, তাহাদিগের ‘বিশ্বনবী’ পাঠ করিতে অনুরোধ করি।"

কবি বইটি গদ্য দিয়ে শুরু করলেও শেষ করছেন পদ্য দিয়েই। শেষ পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন—

তুমি যে নূরের রবি
নিখিলের ধ্যানের ছবি
তুমি না এলে দুনিয়ায়
আঁধারে ডুবিত সবি।
নবী না হয় দুনিয়ায়
না হয়ে ফেরেশতা খোদার
হয়েছি উম্মত তোমার
তার তরে শোকর হাজার বার!

মরুভাস্কর নবীর প্রতি লেখকের ভক্তির সুরভি দেখে আমার কাছে মনে হয়েছে—
‘বিশ্বনবী’ রচনায় কবি গোলাম মোস্তফা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি যে শ্রদ্ধা, ভালবাসা, হৃদয়াবেগ, অনুরাগ, ভক্তি ও নবীপ্রেমের আন্তরিক ভাবোচ্ছ্বাসের তরঙ্গময় প্রকাশ ঘটিয়েছেন; তার ফলে, কবির গোলাম মোস্তফা (নবীর ভৃত্য/গোলাম) নামটি যথার্থ ও স্বার্থক হয়েছে। 

গ্রন্থটিতে নেতিবাচক কিছু বিষয় থাকলেও আজকের আলোচনায় আর টানছি না। তবে, উত্তরসমেত একটি প্রশ্ন নিম্নে আপনাদের নিকট পেশ করছি। 
প্রথমত বলি, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কেনো জানতে হবে আর জানার জন্য গোলাম মোস্তাফার 'বিশ্বনবী' বইটিই বা কেন পড়তে হবে? 
উত্তর: দুনিয়াতে আমাদের জীবনযাপনে, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনের প্রতিটি অঙ্গনে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের জন্য উত্তম ও অনুপম আদর্শ। এই কথাটি অস্বীকার করবার কোনো উপায় নেই। এ কারণে এমনিতেই তাঁর(মুহাম্মদ) জীবনী পাঠ করা প্রতিটি মুসলমানের জন্য একান্ত কর্তব্য। 
অবশ্যপাঠ্য এই জীবনীগ্রন্থ যদি রচিত হয় সাহিত্যসমৃদ্ধ ভাবাবেগপূর্ণ ভাষায়, তা হলে তা হয়ে উঠে সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য বাড়তি আনন্দ ও খুশির কারণ। বক্ষ্যমাণ বইটির সাহিত্যমান সম্পর্কে কিঞ্চিত ধারণা পেতে বাংলা একাডেমীর সাবেক পরিচালক সৈয়দ আলী আহসানের মন্তব্যটি অবশ্যই প্রণিধানযোগ্য। বইটির মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি কি বলছেন; পড়ুন—“বাংলা সীরৎ গ্রন্থগুলির মধ্যে কবি গোলাম মোস্তফার বিশ্বনবী যেমন জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে অন্য কোনোটির ভাগ্যে তা হয় নি। এর ভাব যেমন উচ্চস্তরের, ভাষাও তেমনি প্রাঞ্জল, গতিশীল ও ওজস্বিনী। কবি গোলাম মুস্তফা একাধারে সুনিপুণ বাকশিল্পী, কবি ও ভক্ত। তাই তার আন্তরিকতাপূর্ণ ভক্তির ভাবোচ্ছ্বাস ও কাব্যের লালিত্য গ্রন্থটিকে সুষমামণ্ডিত করেছে। তার ভাব ও ভাষায় ভক্তিপ্রবণ বাঙালি অন্তরের মর্মকথাই কাব্যের ললিত রচনায় প্রতিধ্বনিত হয়েছে। ভক্ত প্রেমিকের মধুঢালা রচনাবিন্যাস বইটিকে অসাধারণ জনপ্রিয়তার অধিকারী করেছে।”

গোলাম মোস্তাফার ‘বিশ্বনবী’র যে কোনো পাঠক সৈয়দ আলী আহসানের কথার সঙ্গে ঐক্যমত পোষণ করবেন বলে আমার বিশ্বাস। তাই সাহিত্যরস আহরণ ও আস্বাদনে প্রয়াসী হবার সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনে নববী আদর্শের উজ্জীবন ঘটাতে আগ্রহী প্রতিটি ব্যক্তিকেই আমি মনোহর প্রচ্ছদ ও ঝকঝকে ছাপার কালজয়ী এই বইটি সংগ্রহ করে পাঠ করার জন্য বিনম্র পরামর্শ প্রদান করে বিদায় নিচ্ছি। আমার বিশ্বাস, এ বিশাল গদ্য কাব্যটি আরও সুদীর্ঘকাল বাঙালি পাঠককে বিমুগ্ধ করে রাখবে—যেমনভাবে বিগতদিনগুলো আমাদের রেখেছে। পরিশেষে এককথায় বলতে পারি— 'বিশ্বনবী' আমার 'সুখকর' পাঠের মধ্যে একটি। 
আপনি সেই চাদর—
যে চাদর উম দেয়— দরদের ঘোর লাগায়।
আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখে। মস্তিষ্কের কোনায় কোনায় মায়ার খুশবু ছিটায়। নীরব নিবিড় দোলা দেয়— প্রাণে-প্রাণে, গানে-গানে, ফুলে-ফুলে।

রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বাইয়ানি সাগিরা.................

৩০/১২/২১

মঙ্গলবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০২১

আমাদের প্রত্যেকের জীবনে,
নীরেন্দ্রনাথের বন্ধু— অমলকান্তি'র মতো একটা বন্ধু থাকে। 
থাকে—ই। 
যে— রোজ দেরি করে ক্লাসে আসে, পড়া পারে না। 
শব্দরূপ জিজ্ঞেস করলে অবাক হয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে থাকে।
যে— ডাক্তার, মাষ্টার, উকিল কিচ্ছু হতে চায় না। কিচ্ছু না।
যে শুধু রোদ্দুর হতে চায়— শুধুই রোদ্দুর। ক্ষান্তবর্ষণ কাক-ডাকা বিকেলের সেই লাজুক— রোদ্দুর।

২৯/১২/২১

মঙ্গলবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০২১

আম্মা—
যিনি আমার জন্মদিন গোটা গোটা অক্ষরে মনে রাখতেন। মস্তিষ্কে না কেবল, কলবেও গেঁথে রাখতেন। একটু বড়ো হওয়ার পর যখন বুঝতে শিখি; তখন যা দেখতাম তা হলো— ডিসেম্বর মাস ডুকলেই আম্মা ঘনঘন ক্যালেন্ডার দেখতেন আর খুব খোশমেজাজে থাকতেন। জন্মদিনের দিন যত ঘনিয়ে আসতো আম্মার খোশমেজাজের খুশবু— আমার চারপাশে তত বেশি মৌ-মৌ করত।  যেদিন আমার জন্ম সেদিন আম্মার‌ও 'মা' হিসাবে জন্ম। নতুন পরিচয়ে নতুন পৃথিবীতে প্রজাপতির মতোন পাখা মেলা। সর্বমহলে নতুন পরিচিতি। মায়ের পরিচিতি।
কি উৎসব! কি আমেজ! একজন কন্যারূপে পদার্পণ, আরেকজন মা। স্বাভাবিকভাবেই আম্মার কাছে দিনটি স্পেশাল, শুধু কি স্পেশাল— অনেক দরদের, অনেক মমতারও। 

আম্মা বিশ্বাস করেন— অসংখ্যা মানুষ আমাকে নিঃস্বার্থে ভালোবাসে। স্মরণ করে। আমি খুব ভয় পাই এসব ভালোবাসায়, এসব মমতায়। আমি খেই হারিয়ে ফেলি। কিছু বলার থাকলেও বলতে পারিনা। প্রকাশ করতে পারি না। সব ভালোবাসার তো আর প্রতিউত্তর হয় না —তাই না আম্মা?  তাই ফ্যালফ্যাল চোখে শুধু দেখে যাই আর ভাবি মানুষ কত নরম! মখমল কোন্ ছার! হতে পারে হাউয়াই মিঠাইয়ের মতোন।

প্রবাদে আছে না—মানুষ ভালোবাসার কাঙাল। সে যেই হোক না কেন ছলেবলে সে ভালোবাসা চায় এবং ভালোবাসা নিয়ে ভালো থাকতে স্বাছন্দ্য বোধ করে। আমিও চাই আম্মা, তবে আপনার ভালোবাসা। শুধুই আপনার।  আমি আপনারে নিয়াই থাকতে চাই— আমার জীবনের প্রতিটা জন্মদিন, প্রতিটা উৎসব, প্রতিটা হুল্লোড়, প্রতিটা মুহূর্তে। 
বিশ্বাস করেন—আখেরে আপনার চলে যাওয়া আমার কাছে আপনার থেকে যাওয়ার মতোই রঙীন। চান্নিপসর রাতের ঢঙে ফকফকে রঙীন। 

দ্যাখেন— আজকে কতশত মানুষ ইনবক্সে  শুভেচ্ছাবার্তা পাঠিয়েছে। কিন্তু কেউ আপনার মতোন 'প্রথম' হতে চায়নি। প্রথম শুভেচ্ছা জানিয়েছে এটা নিয়ে আমার সাথে তর্কালাপে জড়ায়নি। কেউ না। 

আম্মা প্লিজ— দিনটা শেষ হওয়ার আগে দ্রুত 'হ্যাপি বার্থডে; আমিই প্রথম' —বইলা আপনার শুভেচ্ছাবার্তা পাঠান ; সাথে বেনামি অর্কিডের তোড়াটাও। আমি অপেক্ষায় আছি। 
শুনেন; আজকে পাঠান, কালকে পাঠান বা পরশু পাঠান—আমার কাছে আপনিই প্রথম। 
আপনার বার্তার পর সবার বার্তা কাউন্ট করবো। আপনি কোনোদিন দ্বিতীয় না। প্রথম। প্রথমই। আপনাকে কদমবুসি, আম্মা। 

৭/১২/২০২১

রবিবার, ২১ নভেম্বর, ২০২১

প্রতিটা মানুষের জীবনে উদযাপনের জন্য একটি বিশেষ দিন থাকে। 'জন্মদিন' সেই দিনের একদিন। আমার মনে হয়, জন্মদিন আর মা একটি আরেকটির সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে । 
আমি জানি, এই দিনে আরিফার নিশ্চয়ই আম্মার কথা মনে পড়ছে। খুব মনে পড়ছে।

বুকের ভেতর কি যে হাহাকার চলছে।
এক অদ্ভুত যন্ত্রণা— মনে পড়ছে কিন্তু প্রকাশ করতে পারছে না। কান্নাগুলো জমে জমে মেঘ হয়ে যাচ্ছে কিন্তু বৃষ্টির মতোন ঝড়ে পড়ছে না।

আরিফা,
তোর জন্য—
আমার সবটুকু ভালোবাসা।
আমার সবটুকু বসন্ত। 
আমার সবটুকু মন-খারাপ। 
আমি 'আমাকে' তোর নামে—লিখে দিলাম।
পুরোটা দিলাম—

প্রতিবছর নিয়ম করে 'প্রথম' শুভেচ্ছা জানাতো আম্মা— এইবার না হয় 'আমিই' জানালাম, 'আমরা' জানালাম।

হ্যাপি বার্থডে আরিফা। 
কথা দিলাম, তোকে মাথায় করে রাখবো—যেমনটা আম্মা রাখতো। তোর জন্য লাল টুকটুকে ভালোবাসা।  ♥

২২/১১/২১ 

বৃহস্পতিবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২১

১|

বৃহস্পতিবার। ভোর ৪টা ৩০। নিয়মমাফিক মোবাইলের এলার্মেই ঘুম ভাঙলো। শহরে এখনো ঝাঁকিয়ে শীত না নামলেও হালকা শীতের আমেজ তো বইছেই।  চারিদিকটা তাই হালকা কুয়াশায় আচ্ছন্ন। কুয়াশার বুক ভেদ করে যেন— ফুটে উঠছে আলোর রেখা। মক্তব থেকে কুয়াশায় ভেসে আসছিলো মুয়াজ্জিনের দরদিয়া কণ্ঠে—"আস-সলাতু খাইরুম মিনান নাউম/ আস-সলাতু খাইরুম মিনান নাউম"। সালাত শেষ করলাম। তারপর দ্বিতীয় দফায় আবার ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ক্লাস- সকাল ৯টা ৪০-এ। ভার্সিটির গাড়ি- ৯টা ২০-এ। মোবাইলে এলার্ম সেট করলাম ৮টা ৫০-এ। সময়মত 'ক্রিং ক্রিং' টোনে এলার্ম বেজেই চলছিলো, কিন্তু ঘুম আর ভাঙতে চাচ্ছিলোই না। গড়িমসি করে উঠতে উঠতে ভার্সিটির গাড়ির আর নাগাল পেলাম না। ক্লাসটাও যেন মিস না হয় তাই তড়িঘড়ি করে, টাট্টুঘোড়ার মতো ছুটতে লাগলাম।  

"Research Methodologies & Action Research" এবং "The Literature of Civil Rights" এর পরপর দুটো ক্লাস শেষ করে স্বস্তিতে গাড়িতে চাপলাম। মেইন সড়কে এসে আরেকটা গাড়ির জন্য দাঁড়িয়ে আছি। পিছন থেকে একটা ট্রাক খুব ফাস্ট ছুঁ মেরে আমাদের শরীর ছুঁয়ে গেল। একেবারে গা ঘেঁষে যাওয়া যাকে বলে। আমাদের পজিশন  যদি একটু এদিক সেদিক হতো আজকেই আমাদের নামের আগে 'মৃত অমুক / মৃত তমুক' লাগতে পারতো। কিন্তু সবই তাঁর ইচ্ছে।  আমরা এখনো নিঃশ্বাস নিচ্ছি। আমরা এখনো বেঁচে আছি।

কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বলে দেয়া হয়েছে যে, মৃত্যুর জন্য সময় নির্ধারিত রয়েছে। সে সময় উপস্থিত হয়ে গেলে কেউ বাঁচতে পারবে না। আবার যদি সে সময় তখনো না আসে, তা হলে কেউ মরতেও পারবেনা।

এভাবেই নানা জায়গায় বলা হয়েছে, কোনো কষ্ট বা ক্ষতিসাধন করা না করা একান্তভাবেই আল্লাহর ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। যতক্ষণ পর্যন্ত তাঁর ইচ্ছা ও হুকুম না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কেউ আমাদেরকে কষ্ট দিতে ও ক্ষতি সাধন করতে পারবেনা। আর যখন তার পক্ষ থেকে হুকুম হবে, তখন কেউ আমাদেরকে কষ্ট ও ক্ষতি থেকে রক্ষাও করতে পারবেনা।

>>সূরা আল ইমরানে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর কারো মৃত্যু আসতে পারে না আল্লাহর হুকুম ব্যতীত। (মৃত্যুর জন্য) নির্ধারিত সময় লেখা হয়ে গেছে।’ (সূরা আল ইমরান : আয়াত ১৪৫)। 

>>অন্য আরেক জায়গায় বলা হয়েছে, ‘যখন তাদের মৃত্যুকাল উপস্থিত হয়ে যাবে, তখন না এক মুহূর্ত পেছনে থাকতে পারবে, না এগিয়ে যেতে পারবে (ঠিক নির্ধারিত সময়ে তুলে নেয়া হবে)। (সূরা ইউনুস : আয়াত ৪৯)।

২| 

দুপুর ১:৪০। ওই যে ট্রাক এক্সিডেন্টের ঘটনাটি ঘটলো সেই সুবাধে সড়কপথে কিছুক্ষণ দাড়িয়ে আছি। সময় নিচ্ছিলাম, গাড়িতে চড়চ্ছিনা। ছোটো খালার বাসা থেকে পায়ে হেটে মাত্র ৬/৭ মিনিট পথের দূরত্বে অবস্থান করছিলাম। পেটে প্রচণ্ড খিদা। প্রয়োজনীয় কিছু কাজ আছে, বাসায় গিয়ে খাওয়ার সময়ও নাই।  তাই ভাবলাম ডিম চপই হয়তো আজকের দুপুরের খাবার। কিন্তু মনে মনে ছোটো খালার বাসায় গিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করার কথাও মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। ভাবতে ভাবতেই আচমকা ফোনটা বেজে উঠলো। কাকতালীয়ভাবে ফোনের স্ক্রিনে দেখলাম 'ছোটো খালা'।  কোনো কাজটাজ দিবে ভেবে কলটা ধরিনি।  আবার কল। তারপর আবার কল। অবশেষে ধরলাম। ও-পাশ থেকে বেশ ধমকের সুরেই বলছেন—কিরে ফোন ধরিস না কেন? তুই আশেপাশে থাকলে বাসায় আয়। কাজ আছে। কাজের কথা শুনে মুখ আর মন দুটোই পানসে হয়ে গেল। 

তারপর ভাবলাম, যেহেতু উনার বাসার আশ-পাশেই ঘুরঘুর করছি তারচে বরং চলেই যাই। গেলাম। প্রায় ২টা ৩০ ছুঁইছুঁই। উনার বাসায়, কবজি ডুবিয়ে হাঁসের মাংস আর পোলাও খেলাম। সাথে মাখানো সালাদ। আমার খুব প্রিয়। দুপুরে খাবারটা ডিম চপ থেকে হাঁসের মাংস। তারপর ৩০/৪০ মিনিটের একটা শান্তির বিশ্রাম শেষ করে, বের হয়ে পড়লাম নিজের কাজে। 

দ্যাখেন, আমি আগামি  দশ বছরে কত টাকা আয় করবো বা আগামি দশ বছরে কি কি খাবার কতটুকু খাবো— সব কিছুই এক আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত। সকলের রিযিকের মালিক তিনিই। কারো রিযিক কমানো-বাড়ানো বা জুতসই করা সবই তাঁর এখতিয়ার। সারা দুনিয়ার মানুষ মিলেও যদি আপনার বা আমার রিযিক বন্ধ করতে চায় কিন্তু আল্লাহ না চাইলে কেউ পারবে না আবার আল্লাহ রিযিক দিতে না চাইলে সারা দুনিয়ার মানুষ মিলেও আপনাকে বা আমাকে এক লোকমা খাবার খাওয়াতে পারবে না। তিনি আমাদের জন্য যতটুকু নির্ধারণ করে রেখেছেন, ঠিক ততটুকুই কেবল আমরা ভোগ করতে পারি বা পারব। খুব স্মুথলী।

কুরআনের অনেক সূরায় রিযিক সম্পর্কে বলা 
হয়েছে—

>>আল্লাহ পাক উত্তম রিযিকদাতা। (সুরা জুমা : ১১)। 

>>নিশ্চয় আল্লাহ পাকই রিযিকদাতা। (সুরা জারিয়াত : ৫৮)। 

>>পৃথিবীতে বিচরণকারী প্রত্যেকটি প্রাণীর জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহ পাক নিজেই গ্রহণ করেছেন। (সুরা হুদ : ৬)। 

>>আল্লাহ পাকই তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা রিযিক বাড়িয়ে দেন এবং যাকে ইচ্ছা তাঁর রিযিক সীমিত করেন। নিশ্চয় আল্লাহ পাক সব বিষয়ে সম্পূর্ণ অবগত। (সুরা আনকাবুত : ৬২)।

-------------------------------------------

আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলাই আমাদের হায়াত-মউতের মালিক। তিনিই আমাদের রিযিকদাতা। শুধু রিযিকদাতা নয়; উত্তম রিযিকদাতা। এবং তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ পরিকল্পনাকারি। জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে তিনি আছেন, শুধু কি আছেন?—সবটুকু দিয়ে আছেন। এযাবৎ আমার সাথে যা যা ঘটেছে সবকিছুই ভালো ঘটেছে ; বরঞ্চ বলতে হয়—'সর্বোচ্চ ভালোটাই' ঘটেছে। 
আলহামদুলিল্লাহ। মাআসসালাম। 

আঠারো  | এগারো |

মঙ্গলবার, ২ নভেম্বর, ২০২১

আম্মা, আমার মিঠাগদ্য—


সেদিনকার সন্ধ্যার আলাপ—
ফ্লোরে সবাই বসে বসে এটা-ওটা আলাপ করে যাচ্ছিল, আর আমি খাটে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে বেমালুম পড়ে আছি। মাঝেমধ্যে হু-হা করে আড্ডায় নিজেকে শামিলও রাখছি।

হঠাৎ সায়মা বলে উঠল,
আপা— এবার সামনের ঘরের পুরোনা খাটটা ভেঙে ফেলব। এই খাটটা বেশ নড়বড়ে হয়ে গেছে। এমাসেই এখানের জন্য নতুন একটা খাট কিনব।

আমার বুকটা মড়মড় করে ভেঙ্গে যাচ্ছিল। চোখের পানিটা লুকাতে লুকাতে, দুই হাত দিয়ে খাটটাকে জড়িয়ে ধরতে চাচ্ছিলাম—শক্ত করে।

ফজরের নামাজের পর আম্মা এই খাটের কোনে বসত। এই খাটেই জায়নামাজ বিছিয়ে আম্মা নামাজ পড়ত আর মনভরে আমাদের জন্য মঙ্গল প্রার্থনা করত।
প্রায়ই ঠিক দুপুরে, মাথার উপরে হাইস্পিড পাখা চলছে, আম্মা তার ঘামে ভেজা শরীর নিয়ে রান্নাঘর থেকে দৌড়ে এসে এই খাটে কিছুক্ষণ বসত আর বলত— আহ শান্তি!

সামনের রুমে এই খাটটিতে আমরা তিন বোন মিলে-ঝিলে ঘুমাতাম। এই খাটটি বেসিক্যালি আমাদের তিন বোনেরই। আম্মা প্রায়ই গল্প করতেন, এই খাটটির বয়স আর আমার বয়স নাকি সেইম-সেইম।
কিন্তু আম্মার চলে যাওয়ার মাস খানেক আগে থেকে আম্মা নিয়মিত আমাদের সাথে এই খাটে ঘুমাতে শুরু করেন।
তার আগে,
আম্মা নিজের রুমে ঘুমাতেন যার ফলে—আমি তাঁকে ঘুমন্ত অবস্থায় খুব একটা দেখতাম না। তবে সেইসময় আমাদের সাথে থাকার ফলপ্রসূ আমি রোজ আম্মাকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখেছি। আমি চোখের সামনে আমার জান্নাত দেখতাম। প্রাইসলেস দৃশ্য!

সারাদিনের প্রাণচঞ্চল মানুষটা কত শান্তির, সহজ ঘুম ঘুমাচ্ছেন—
কি মুগ্ধতা আহ! আমার কলজের মাঝে গোটাগোটা হরফে আঁকা সেই দৃশ্যকাব্য।

সায়মাকে বলতে ইচ্ছে করছে—আমাদের সামনের ঘরের খাটটি ভাঙ্গিস না প্লিজ। এই খাটটি আমাদের সাথে বুড়ো হোক। পঁচে গলে যাক। তারপরও রেখে দিস—

এই খাটে এখনো রোজ যখন উপুড় হয়ে শুই— মনে হয় আমি আমার আম্মার বুঁকে শুয়ে আছি। আমিতো এটুকু নিয়েই বাঁচি।

আম্মা যেদিন চলে যাবেন, সেদিন সক্কালবেলা কবুতরের স্যুপ খাওয়ালাম নিজ হাতে, এই খাটেই বসে। আব্বাকে বললাম রাতের জন্য ইলিশ আইনেন। রাতে আম্মাকে ইলিশ দিয়ে ভাত খাওয়াবো। মাগরিবে আম্মার জানাজা হলো।

এখন—আমাদের বাসায় ইলিশ আসে, কিন্তু আমাদের আম্মা আর আসে না।

আম্মার খুউব পেট ব্যাথা হলে যে বালিশ টা পেটে চেপে ধরে ঘুমাতো, সেই বালিশটা থেকে আমি একটি প্যাচপেচে মালিশের তেলের গন্ধ পাই। আম্মা পেটে যে তেলটা মালিশ করতেন এটি—সেটিরই গন্ধ। আমি বালিশটা না ধুয়ে রেখে দিছি আলমারিতে। সময়ে-অসময়ে বের করে আমার পেটের সাথে লাগিয়ে রাখি। আম্মার গায়ের ঘ্রাণ পাই। জান্নাতি ঘ্রাণ।
আমার আম্মা—আমি যেন দম আটকে মরে না যাই তার জন্য কত কিছু রেখে গেছে। আমি এখনো তাই বেঁচে আছি। হাপিয়ে পড়ি না এক মুহূর্তের জন্যেও।

আম্মা, দেখেন—
আপনার বড়কন্যা কত নরম। শিমুল তুলার মতো নরম। তুলতুলে। আপনারে নিয়া কিরকম মিঠাগদ্য লিখে। আপনাকে কদমবুসি, আম্মা।

২/১১/২০২১ইং

শনিবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২১

প্রতিটা মায়ের মৃত্যুর সংবাদ—
আমার মায়ের মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। 

২৩/১০/২১

শুক্রবার, ২২ অক্টোবর, ২০২১

আমি যে 'বিদ্যা' সবসময় ভয় পাই— সেটি হলো 'অল্প বিদ্যা'।

২২/১০/২১

কাজলের বয়ে বেড়ানো সুখ



কাজলের বয়ে বেড়ানো সুখ
-সালমন সালমা।

কোনো এক শীতের সকাল, যে শীত অন্যসব ঋতু থেকে আলাদা। যে সকাল অন্যসব সকাল থেকে আলাদা। কুয়াশার চাদরে মোড়ানো গোটাশহর যেনো নিশ্চুপ, হাড় শীতল করে প্রকৃতির পাখপাখালি, কর্মস্থলের যন্ত্রপাতিও যেনো ফ্রিজ হয়ে আছে। এ সময় এক ফালি রোদ সকলের কাছে বহুল প্রতীক্ষিত হয়ে ওঠে। শীতের সকালে মানুষের মাঝে এক অজানা অলসতা ভর করে। লেপ মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে থাকাতেই যেন তখন স্বর্গীয় সুখ অনুভব হয়। কিন্তু জীবিকার তাগিদে, জীবন থেমে থাকে না, বেঁচে থাকার বাস্তবতা শীতকেও দূরে সরিয়ে দেয়। কম্বল নামিয়ে, আড়মোড়া ভেঙে উঠতেই হয় সবাইকে। নিজেকে তৈরি করে নিতে হয় কাজে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। 


তদ্রূপ এমন এক শীতের সকাল। শনিবার। সদ্য কলেজ পড়ুয়া এক তরুন, কাজল।  আজ তার কলেজ ছুটি। তাই সকালে তার বাড়ির পাশের মামার টং দোকানে এসেছে চা খেতে। সকাল ৭ টার নাগাদ। কাজল, এসে দেখে মামা দোকান খুলছে মাত্র। 


কাজল: মামা আইজ এতো দেরি কেন? 

মামা: আর কইয়েন না যেই শীত পড়চে, বউ পোলাপানের কথা ভাইবা দোকানটা খুললাম। বয়েন মামা। 


কিছুক্ষণ পর মামা চা দিলো, 

কাজল চায়ে চুমুক দিতে দিতে খেয়াল করতে লাগল মামার দোকানের দক্ষিণ দিকে, সাদামাটা একটা ছেলে, এই বছর ১১ কিংবা ১২ এর মতো হবে।


কাজল দেখছে, 

সূর্যের বিদায় বেলার আলোতে কি পবিত্র ছোঁয়ায় ছেলেটির ঘুম ভাঙ্গছে। সে ঘুম ঘুম চোখে তাকিয়ে দেখে সকাল হয়ে গেছে। তারপর সে তার ঘাসের বিছানা ছেড়ে উঠে। রাজার আবেশে, একটা বড়ো  গাছের পিঠে পিঠ ঠেকিয়ে হেলান দিয়ে বসে। কাজল ভাবছে সেটিই বোধহয় ছেলেটির থাকার জায়গা। 

ছেলেটি তার নিষ্পাপ চোখ দিয়ে এপাশ- ওপাশ তাকিয়ে চিন্তা করতে থাকে, সকাল তো হলো এখন কি খাবো? খাবার কোথাই'বা পাবো? রাতে খেতে না পারায় পেটে অসহ্য খিদে লেগেছে। 


কিছুক্ষণ পড়েই ছেলেটার নাকে একটা সুন্দর ঘ্রাণ আসছে। যে ঘ্রাণটা ভদ্র সমাজে খুব বাজে ঘ্রাণ বলে মনে হয়। কাজল অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে, ছেলেটির মুখে এক বর্ণ হাসির ছোরা মিলছে। কাজল পাশ ফিরে দেখে ডাষ্টবিন থেকে একটা বাজে গন্ধ আসছে। যে গন্ধ কাজলেরও সহনীয়তার বাইরে। কিন্তু ছেলেটি দৌড়ে ডাস্টবিনটার পাশে এসে দাঁড়ায়, ভালো মন্দ কিছু ফেলে দেওয়া খাবার পাবে বলে। কিন্তু দুর্ভাগ্য  ডাষ্টবিনে খাবার মতো কিছুই পায়নি। কাজল বিষয়টা বুঝতে পারে। ছেলেটি গুটি গুটি পায়ে আবার সেই জায়গায় গিয়ে বসে। আকাশ জমিন ফেটে মন খারাপ করছে ছেলেটির চোখেমুখে।  


তারপর কাজল টং দোকান থেকে উঠে ধীরেসুস্থে  সেই ছেলেটার কাছে যায় আর ঘাসের উপর বাবু হয়ে বসে । ছেলেটি তখন ভয় ভয় চোখে তাকায় কাজলের দিকে।


কাজল ছেলেটিকে ডেকে বলে, কিরে কি নাম তোর? 

ছেলেটি বলে: হুম আমার নাম? কেন, আমার নাম দিয়া আপনের কি দরকার?


কাজল বলে, আমার একটা ভাই আছে ঠিক তোর মতো, তার নাম রাখব। তাই তোর নামটা জানতে চাইলাম। ভালো লাগলে তোর নামটাই রেখে দিবো।

ছেলেটা বলে, কি-যে কন না ভাই। আইচ্ছা যাক। আমার নাম হইলো জিহান। আগে পরে কিছু নাই, শুধু জিহান। আচ্ছা ভাই, আপনার কাছে ৫টা টাহা অইব? আমাৱে ৫টা টাহা দিবেন?


কাজল: কেনো? ৫ টাকা দিয়া তুই কি করবি? 


জিহান: ভাই, রাইতে কিছু খাইনাই । সকালেও ওই ডাস্টবিনে খাওয়ার মতো কিছু পাইনাই। পেটে অসহ্য খিদা। যদি কিছু খাইতে পারি….. 


কাজল কিছুক্ষণ ভেবে..........টং দোকানের মামাকে ডাকে, মামা; একটা চা আর দুইডা বিস্কিট দিয়ো তো।


আনতেছি মামা।


আচ্ছা জিহান, তোকে তো আমি সকালের নাস্তা করাবো কিন্তু বিনিময়ে তুই আমারে কি দিবি বল?


জিহান বলে আপনি কি চান? আপনার মাথা টিপা দিমু?


কাজল: না আমি একটু জিহানের গল্পটা শুনতে চাই।


জিহানের গল্পের সূচনা ;


একটা মহিলাকে জিহান মা বলে জানত এবং উনাকে মা বলেই ডাকত। কিন্তু তার আসল বাবা-মা কে, জিহান বা সেই মা সেটা জানত না।


হঠাৎ এক সকালে,


তার পালিত মা বলে, আমি তোর আসল মা না, তোর আসল বাবা-মা কে সেটাও আমি জানি না। তোকে আমি এক বৃষ্টি ভেজা রাতে কুঁড়েয়ি পেয়েছি। নবজাতক, গা হাত পা ঠান্ডা, খুব মায়া লেগেছে ফুটফুটে মায়া। তারপর আমার চাঁদরে জড়িয়ে তোকে ঘরে নিয়ে আসি। 


জিহান বলে না, তুমিই আমার মা, আমি এটাই জানি ঐ কথাটি জিহান বিশ্বাস করে না। 


এমনি করে  হঠাৎ একদিন তার পালিত মা মারা যায়। মারা যাওয়ার সময় তার মা তাকে বলে যায়, যদি পারিস তবে তোর নিজের বাবাকে মাকে খুঁজে বের করিস। 


মায়ের সাথে কোনভাবে সুখে দুখে দিন কাটছিলো জিহানের।


কিন্তু শেষ আশ্রয়স্থল তার মা চলে যাওয়ার পর থেকেই শুরু হয়, জিহানের জীবনের মূল ট্রাজেডি। সে এই নিষ্ঠুর পৃথিবীর সাথে যুদ্ধ করে চলতে থাকে আর তার নিজের মা-বাবাকে খুঁজে বেড়াতে থাকে। (কারণ মৃত্যুর সময় ঐ মা বলে দিয়েছিল)।


প্রতিনিয়ত না খেয়ে উপোষ থেকে, স্টেশনে স্টেশনে রাত কাটিয়ে, এই নিষ্ঠুর সমাজের সাথে লড়াই করছে জিহান।  


আমাদের সমাজের বিত্তবান, জ্ঞানী লোকেরাই সজোরে লাথি মারছে তার ললাটে। অসহায়  জিহান উপার্জন আর বেঁচে থাকার লক্ষে হন্ন হয়ে কাজ খুঁজে বেড়ায়।

আধ পেটে জিহান এখন রাস্তায় থমকে দাঁড়িয়ে । মানুষের ফেলে দেয়া খাবার-ই জিহানের এখন প্রাত্যহিক আহার। জিহান আশ্রয় পথে ঘাটে। তারপরও অভিযোগের রেশ নেই, দিব্যি চলছে। 


মা'র মৃত্যুর পর কিছুদিনে জিহান খানিকটা বড় হয়েছে। শিশু থেকে পথশিশু হয়েছে। চুল গুলো বেশ উষ্কখুষ্ক, গায়ে হাফ হাতা গা ঝোলানো শার্ট, পরনে মেরু রংয়ের একটি প্যান্ট, এই তার পোশাকআশাক, বাহারি সাজ। 


এক রাতে জিহান গাছের নিচে বসে খুব কাঁদছে, তার মা'র কথা মনে করে। বাইরে ঝুম বৃষ্টি। জিহান বৃষ্টিতেই কাঁদে। বৃষ্টি আর তার কান্না একাকার হয়ে মিশে যায়।  তার চোখের নিষ্পাপ জল এই শহর দেখতে পায় না। আচমকা,  রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলো এক ভদ্রলোক। বৃষ্টি দেখে ভদ্র লোক গাছের নিচে গিয়ে দাঁড়ায়, আশ্রয় নেয়। 


তিনি লক্ষ্য করল, তার পাশে ছোট ছেলেটি খুব কাঁদছে। জিজ্ঞেস করল, তুমি কাঁদছো কেনো? জিহান বললো এমনি। তখন ভদ্রলোক বললেন তুমি কোথাই থাকো? জিহান বলল স্যার আমি এখানেই থাকি। আমার মা-বাবা কেউ নাই।


পর মুহুর্তে জিহানের দু'মুঠো খাওয়ার আর থাকার একটা বন্দোবস্ত হলো। একটা নিশ্চিত আশ্রয় হল ঐ ভদ্রলোকের বাসায়। ভদ্রলোক সেই বৃষ্টির রাতে গাছতলা থেকে জিহানকে তার নিজের বাসায় আশ্রয় দেন। 


সেই ভদ্রলোক শিশুদের নিয়ে একটি সংস্থায় কাজ করেন। গরীব - দরিদ্র শিশুদের সাহায্যে করেন। তাদের পড়াশোনা, তাদের একটি নিশ্চিন্ত ভবিষ্যৎ এসব নিয়ে দিনরাত খাটেন।

একজন দারুন সমাজ সেবকও বটে। 


ভদ্রলোকের বাসায় আসার পর জিহানের প্রত্যাহিক রুটিনে খুব নিয়ম এসেছে, কড়া নিয়ম। ঘুম থেকে উঠে ঘর পরিষ্কার করা, ভদ্রলোকের জন্য নাশতা তৈরী করা, ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলা, কাপড় কাঁচা এই করেই সকাল থেকে রাত হয় জিহানের।

ভদ্রলোকের আদেশের বাইরে এদিক সেদিক হলেই পিঠে বেত্রঘাত পড়ে। 

সারাক্ষণ জিহান এখন ভয়ে দুমড়েমুচড়ে থাকে। মাঝে মাঝে জিহান ভাবে তাতে কি, দু'মুঠো খেতে আর রাতে শুতে তো পারছি। অল্পতেই জিহান মহাসুখি। 


এক সকালে, জিহানের প্রচন্ড জ্বর। জিহান বিছানা ছেড়ে উঠতে পারছে না। তাই জিহান ভদ্রলোককে সকালে ঘুম থেকে ডাকতে পারেনি। সেজন্য তার অফিসে যেতে কিঞ্চিত দেরি হয়েছে। খুব জ্বরের মধ্যেও ভদ্রলোক জিহানকে ছাড় দেন নি। প্রচুর মেরেছে। 

জিহান এখন একটু বুঝতে শিখেছে। বিত্তবান লোকদের থেকে খানিকটা বিবেকবান হয়েছে জিহান। তার বিবেক সমাজের ঐ ভদ্রলোকসুলভ  লোকের চেয়েও উত্তম। ভদ্রলোকের করা সংগঠন, শিশুদেরকে নিয়ে লোক দেখানো কাজ খানিকটা কৌতুকরস মনে করছে জিহান। তার মতে, এমন কৌতুক না করাই উত্তম যা নির্মম।


সেদিন জিহান মার খেয়ে পালিয়ে যায় ভদ্রলোকের বাসা থেকে। 

আবার সেই অনিশ্চিত জীবন। আশ্রয় সেই গাছতলায়, তবে এই জীবনে জিহান দিনশেষে খুশি। মনের আনন্দই যে তার দেহের, প্রাণের শক্তির জোগানদার।  জিহান বেঁচে থাকার গান গায়। জিহান এখন লড়াই এর জন্য প্রস্তুত দিনের শুরুতেই। 


কাজল অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তার চোখের দিকে। জিহানের ঐ নিষ্পলক চোখ দিয়ে অশ্রু বর্ধন হচ্ছে। যা রীতিমত কাজলের হৃদয় শীতল করে দিচ্ছে। কাজল খুব সাধারাণ পরিবারের, মফস্বল শহরে বেড়ে উঠা উঠতি এক তরুন মাত্র। না বিত্তবান, না সমাজে প্রতিষ্ঠিত। তবে কাজল পথ শিশুদের জন্য একটা সংস্থা তৈরী করেছে তার বন্ধুদের নিয়ে। তারা প্রতিনিয়ত পরিশ্রম করে, টিউশনির টাকা জমিয়ে এই সংস্থার ব্যয় বহন করে। তারা শিক্ষার আগে চায় পথশিশুদের থাকা-খাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে। তারা, পথশিশুদের নিরক্ষরও রাখতে চায় না। কাজল বলে এই সোনার বাংলা ততদিন সোনায় প্রতিফলিত হবে না যতদিননা বিত্তবানরা জমিতে এসে, শষ্য না ফলাবে। অন্যথায় একদিন এই শষ্য ফুরিয়ে যাবে, আমাদের শহরে ফোটা এই শিশুরাও নিমিষে হারিয়ে যাবে বৃষ্টির ফোঁটার সাথে সাথে। 


কাজলের সাথে জিহানের দিন এখন ভালোই কাটছে। তবুও ঝাপসা হৃদয়ে জিহানের চোখ এখনো তার হারানো বাবা-মা কে খুঁজে। 

অন্যদিকে, কাজল আর তার বন্ধুরা মিলে কাজ করছে পুরোদস্তরে। থেমে থাকার জো নেই তাদের। নতুন কিছু করাই যেনো তাদের ধর্ম। এই কাজলরাই তো আলগোছে আগলে রাখছে হাজারো পথশিশুকে। দু'পায়ে ছেড়াজুতো আর কাঁধে মলাটো ব্যাগ ঝুলিয়ে হেঁটে চলছে তাদের অজানা গন্তব্যের দিকে। 

সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১

বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১

আমি নির্বাক চোখে দেখতাম—
আপনার গাল বেয়ে নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়া, দু-ফোঁটা চোখের জল।
দেখতাম— 
জায়নামাজে আপনার পবিত্র স্নান! 

২৪/০৯/২১

মঙ্গলবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২১

আব্বা,

আমার জীবনের কাব্যগ্রন্থ।

শ্যাওলা পড়া খসখসে পাতার,

খায়েশ-হীন তুলতুলে হরফ।


আম্মা,

আমার অরচিত শ্রেষ্ঠ কবিতা। 


২১/০৯/২১

রবিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১

বই: বিস্রস্ত জর্নাল। লেখক: আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ।

জীবনের একটা পর্যায়ে এসে তিনি তাঁর দিনলিপিতে বলছেন- 

লিখতে শুরু করলাম ছিটেফোঁটা। অন্তত কয়েকটা বছর বেঁচে থাকা ভীষণ প্রয়োজন।  মস্তিষ্কের খাঁজে খাঁজে লেলিহান আগুনের মতো অজস্র শব্দের গনগনানি।  অন্তত তিন-চার হাজার পৃষ্ঠা না লিখতে পারলে কিছুই জানিয়ে যাওয়া হবে না। 
- ৭.১১.৮৭



বই: বিস্রস্ত জর্নাল। 
লেখক: আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ।
প্রকাশক: মফিদুল হক, সাহিত্য প্রকাশ। 
ক্যাটাগরি: জীবনী ও স্মৃতিকথা।  

**
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। তিনি একজন শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও সমাজসংস্কারক। তার জীবনের উল্লেখযোগ্য কীর্তি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। যা চল্লিশ বছরেরও বেশি ধরে  ‘আলোকিত মানুষ’ তৈরি করে যাচ্ছে। এই মানুষটাকে আমি টেলিভিশনের উপস্থাপক হিসেবে প্রথম পাঠ করি। তারপর, তাঁর আত্মজীবনী 'আমার বোকা শৈশব' পড়ি। তারপর একে একে ভাঙো দুর্দশার চক্র, আসীমের ভেলা, সংগঠন ও বাঙালি।  
এভাবেই লেখকের সাথে আমার পাঠের যাত্রা চলছে......... 

গত ১৩ দিনে শেষ করা বইটির নাম বিস্রস্ত জর্নাল। নাম-সাকিনহীন টুকরোটাকরা লেখা। তাঁর ব্যস্ত জীবনে নিয়মের বাইরে, মাঝেমধ্যে যে অপ্রত্যাশিত অবসর আসতো, সেখানের দুয়েক চিলতে মুহূর্ত নিয়েই সাজানো হয়েছে গোটা বইটি। পড়তে-পড়তে থমকে যেতে হয়েছে কয়েকবার। নিরালা অবসরে ভাবতে হয়েছে শূন্যতা'কে। এটাই টেক্সটের দারুণ পাওয়ার। 

১৮.০১.১৯৮৪ সালে এই জর্নালের যাত্রা শুরু। সমাপ্ত ১৯৯৪ সালে। প্রতিটি সরলবাক্যের যাত্রী আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ গড়গড় করে বলে যাচ্ছেন তাঁর জীবনের নানা দিক, উত্থান-পতন। তাঁর এই যাত্রার সঙ্গী আমিও। বইটি পাঠের সময়, প্রতিটি পাঠক এই যাত্রার সঙ্গী হবে নিঃসন্দেহে। 

বহুরূপী মানুষের কথা, তার ভেতরকার সৌন্দর্য আর কুৎসিতের বড়াই কিংবা লজ্জার সোজাসাপটা  স্বীকারোক্তি। অন্তর্গত দহন ও সত্যান্বেষণ। অগোছালো সংসার গুছিয়ে নেবার তাগিদ কিংবা ভালোবাসা নিয়ে তাঁর সুন্দর ভাবনা, সবেতেই ঠাসা।

আচমকা জন্ম-মৃত্যু কিংবা প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির অনুযোগের সারিতে দাঁড়িয়ে ভাবছেন দেশ, সমাজ আর সাহিত্যের অলিগলির ব্যাপারে। আবার মেয়ের 'আব্বু আসি' এমন বিদায়ও নাড়া দিচ্ছেন তাঁকে। 

কখনো শিক্ষক, কখনো দেশপ্রেমিক, কখনো সাধারণের চেয়ে সাধারণ আবার কখনো অমায়িক পিতা হিসাবে পাতায় পাতায় স্পষ্ট দেখতে পােলাম তাঁকে।  
আঁকছেন নিজের অভিমান, প্রেম, অনূভূতি, দায়িত্বের কষ্ট, শ্রম আর সাফল্যের উত্তেজনা। জগৎসংসার, সবই একটা জীবন-যাপন, সবই কেবল আমোদে-আল্লাদে বেঁচে থাকা। 

গোটা জর্নালটি এলোমেলো, সংক্ষিপ্ত তবে নিদারুণ গভীর, পাবেন জীবনের চরম সব স্বীকারোক্তি।  

**
জর্নাল থেকে প্রিয় কিছু টুকরো লেখা উল্লেখ করলাম। 

▪️বুদ্ধিমানেরা তর্ক করে, প্রতিভাবানেরা পৌঁছে যায়। (১৩.৩.৮৪) 

▪️কেন নিন্দা? কিসের জন্য? আমাদের ব্যক্তিগত অক্ষমতা? ঈর্ষা? অসাফল্য? শক্তিহীনতা?  অন্যের সফলতাকে সহ্য করতে পারার স্নায়বিক অক্ষমতা?  ব্যক্তিগত ব্যর্থতার বিকাশ-বিনাশী সহিংস প্রত্যাঘাত? (২৭.৬.৮৫)

▪️আজকের জন্য যা মর্মান্তিক, কালকের জন্যে তাই সর্বোচ্চ সতর্কতা। (২৮.১২.৮৬)

▪️বাঙালির স্বপ্ন গণতন্ত্র, কিন্তু সে স্বস্তি বোধ করে একনায়কতন্ত্রে। (৩০.৯.৮৮)

▪️যার দানের কথা অন্যে জানে, সে দেয় না, নেয়। (২৭৫নং)

▪️আজকের বাংলাদেশে বড় মানুষ তারাই, যারা মাঝে মাঝে বাংলাদেশে আসে। (২৭৬নং)

**
বি.দ্র: বিস্রস্ত জর্নাল, কেবল জর্নাল-ই। ভুল করেও কেউ উপন্যাস ভাববেন না। বইটিতে এই ব্যাপারে লেখকের চমৎকার একটি বর্ণনা আছে।

রমজানে মী-টাইম, উই-টাইম বের করা খুব টাফ ছিলো। রমজানের একটা ব্যস্ততা তো থাকেই তার সাথে সাথে সবার অফিসের কাজের চাপ। সবমিলিয়ে আমরা একসাথে থাকলে...