জীবনের একটা পর্যায়ে এসে তিনি তাঁর দিনলিপিতে বলছেন-
লিখতে শুরু করলাম ছিটেফোঁটা। অন্তত কয়েকটা বছর বেঁচে থাকা ভীষণ প্রয়োজন। মস্তিষ্কের খাঁজে খাঁজে লেলিহান আগুনের মতো অজস্র শব্দের গনগনানি। অন্তত তিন-চার হাজার পৃষ্ঠা না লিখতে পারলে কিছুই জানিয়ে যাওয়া হবে না।
- ৭.১১.৮৭
বই: বিস্রস্ত জর্নাল।
লেখক: আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ।
প্রকাশক: মফিদুল হক, সাহিত্য প্রকাশ।
ক্যাটাগরি: জীবনী ও স্মৃতিকথা।
**
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। তিনি একজন শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও সমাজসংস্কারক। তার জীবনের উল্লেখযোগ্য কীর্তি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। যা চল্লিশ বছরেরও বেশি ধরে ‘আলোকিত মানুষ’ তৈরি করে যাচ্ছে। এই মানুষটাকে আমি টেলিভিশনের উপস্থাপক হিসেবে প্রথম পাঠ করি। তারপর, তাঁর আত্মজীবনী 'আমার বোকা শৈশব' পড়ি। তারপর একে একে ভাঙো দুর্দশার চক্র, আসীমের ভেলা, সংগঠন ও বাঙালি।
এভাবেই লেখকের সাথে আমার পাঠের যাত্রা চলছে.........
গত ১৩ দিনে শেষ করা বইটির নাম বিস্রস্ত জর্নাল। নাম-সাকিনহীন টুকরোটাকরা লেখা। তাঁর ব্যস্ত জীবনে নিয়মের বাইরে, মাঝেমধ্যে যে অপ্রত্যাশিত অবসর আসতো, সেখানের দুয়েক চিলতে মুহূর্ত নিয়েই সাজানো হয়েছে গোটা বইটি। পড়তে-পড়তে থমকে যেতে হয়েছে কয়েকবার। নিরালা অবসরে ভাবতে হয়েছে শূন্যতা'কে। এটাই টেক্সটের দারুণ পাওয়ার।
১৮.০১.১৯৮৪ সালে এই জর্নালের যাত্রা শুরু। সমাপ্ত ১৯৯৪ সালে। প্রতিটি সরলবাক্যের যাত্রী আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ গড়গড় করে বলে যাচ্ছেন তাঁর জীবনের নানা দিক, উত্থান-পতন। তাঁর এই যাত্রার সঙ্গী আমিও। বইটি পাঠের সময়, প্রতিটি পাঠক এই যাত্রার সঙ্গী হবে নিঃসন্দেহে।
বহুরূপী মানুষের কথা, তার ভেতরকার সৌন্দর্য আর কুৎসিতের বড়াই কিংবা লজ্জার সোজাসাপটা স্বীকারোক্তি। অন্তর্গত দহন ও সত্যান্বেষণ। অগোছালো সংসার গুছিয়ে নেবার তাগিদ কিংবা ভালোবাসা নিয়ে তাঁর সুন্দর ভাবনা, সবেতেই ঠাসা।
আচমকা জন্ম-মৃত্যু কিংবা প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির অনুযোগের সারিতে দাঁড়িয়ে ভাবছেন দেশ, সমাজ আর সাহিত্যের অলিগলির ব্যাপারে। আবার মেয়ের 'আব্বু আসি' এমন বিদায়ও নাড়া দিচ্ছেন তাঁকে।
কখনো শিক্ষক, কখনো দেশপ্রেমিক, কখনো সাধারণের চেয়ে সাধারণ আবার কখনো অমায়িক পিতা হিসাবে পাতায় পাতায় স্পষ্ট দেখতে পােলাম তাঁকে।
আঁকছেন নিজের অভিমান, প্রেম, অনূভূতি, দায়িত্বের কষ্ট, শ্রম আর সাফল্যের উত্তেজনা। জগৎসংসার, সবই একটা জীবন-যাপন, সবই কেবল আমোদে-আল্লাদে বেঁচে থাকা।
গোটা জর্নালটি এলোমেলো, সংক্ষিপ্ত তবে নিদারুণ গভীর, পাবেন জীবনের চরম সব স্বীকারোক্তি।
**
জর্নাল থেকে প্রিয় কিছু টুকরো লেখা উল্লেখ করলাম।
▪️বুদ্ধিমানেরা তর্ক করে, প্রতিভাবানেরা পৌঁছে যায়। (১৩.৩.৮৪)
▪️কেন নিন্দা? কিসের জন্য? আমাদের ব্যক্তিগত অক্ষমতা? ঈর্ষা? অসাফল্য? শক্তিহীনতা? অন্যের সফলতাকে সহ্য করতে পারার স্নায়বিক অক্ষমতা? ব্যক্তিগত ব্যর্থতার বিকাশ-বিনাশী সহিংস প্রত্যাঘাত? (২৭.৬.৮৫)
▪️আজকের জন্য যা মর্মান্তিক, কালকের জন্যে তাই সর্বোচ্চ সতর্কতা। (২৮.১২.৮৬)
▪️বাঙালির স্বপ্ন গণতন্ত্র, কিন্তু সে স্বস্তি বোধ করে একনায়কতন্ত্রে। (৩০.৯.৮৮)
▪️যার দানের কথা অন্যে জানে, সে দেয় না, নেয়। (২৭৫নং)
▪️আজকের বাংলাদেশে বড় মানুষ তারাই, যারা মাঝে মাঝে বাংলাদেশে আসে। (২৭৬নং)
**
বি.দ্র: বিস্রস্ত জর্নাল, কেবল জর্নাল-ই। ভুল করেও কেউ উপন্যাস ভাববেন না। বইটিতে এই ব্যাপারে লেখকের চমৎকার একটি বর্ণনা আছে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন