সেদিনকার সন্ধ্যার আলাপ—
ফ্লোরে সবাই বসে বসে এটা-ওটা আলাপ করে যাচ্ছিল, আর আমি খাটে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে বেমালুম পড়ে আছি। মাঝেমধ্যে হু-হা করে আড্ডায় নিজেকে শামিলও রাখছি।
হঠাৎ সায়মা বলে উঠল,
আপা— এবার সামনের ঘরের পুরোনা খাটটা ভেঙে ফেলব। এই খাটটা বেশ নড়বড়ে হয়ে গেছে। এমাসেই এখানের জন্য নতুন একটা খাট কিনব।
আমার বুকটা মড়মড় করে ভেঙ্গে যাচ্ছিল। চোখের পানিটা লুকাতে লুকাতে, দুই হাত দিয়ে খাটটাকে জড়িয়ে ধরতে চাচ্ছিলাম—শক্ত করে।
ফজরের নামাজের পর আম্মা এই খাটের কোনে বসত। এই খাটেই জায়নামাজ বিছিয়ে আম্মা নামাজ পড়ত আর মনভরে আমাদের জন্য মঙ্গল প্রার্থনা করত।
প্রায়ই ঠিক দুপুরে, মাথার উপরে হাইস্পিড পাখা চলছে, আম্মা তার ঘামে ভেজা শরীর নিয়ে রান্নাঘর থেকে দৌড়ে এসে এই খাটে কিছুক্ষণ বসত আর বলত— আহ শান্তি!
সামনের রুমে এই খাটটিতে আমরা তিন বোন মিলে-ঝিলে ঘুমাতাম। এই খাটটি বেসিক্যালি আমাদের তিন বোনেরই। আম্মা প্রায়ই গল্প করতেন, এই খাটটির বয়স আর আমার বয়স নাকি সেইম-সেইম।
কিন্তু আম্মার চলে যাওয়ার মাস খানেক আগে থেকে আম্মা নিয়মিত আমাদের সাথে এই খাটে ঘুমাতে শুরু করেন।
তার আগে,
আম্মা নিজের রুমে ঘুমাতেন যার ফলে—আমি তাঁকে ঘুমন্ত অবস্থায় খুব একটা দেখতাম না। তবে সেইসময় আমাদের সাথে থাকার ফলপ্রসূ আমি রোজ আম্মাকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখেছি। আমি চোখের সামনে আমার জান্নাত দেখতাম। প্রাইসলেস দৃশ্য!
সারাদিনের প্রাণচঞ্চল মানুষটা কত শান্তির, সহজ ঘুম ঘুমাচ্ছেন—
কি মুগ্ধতা আহ! আমার কলজের মাঝে গোটাগোটা হরফে আঁকা সেই দৃশ্যকাব্য।
সায়মাকে বলতে ইচ্ছে করছে—আমাদের সামনের ঘরের খাটটি ভাঙ্গিস না প্লিজ। এই খাটটি আমাদের সাথে বুড়ো হোক। পঁচে গলে যাক। তারপরও রেখে দিস—
এই খাটে এখনো রোজ যখন উপুড় হয়ে শুই— মনে হয় আমি আমার আম্মার বুঁকে শুয়ে আছি। আমিতো এটুকু নিয়েই বাঁচি।
আম্মা যেদিন চলে যাবেন, সেদিন সক্কালবেলা কবুতরের স্যুপ খাওয়ালাম নিজ হাতে, এই খাটেই বসে। আব্বাকে বললাম রাতের জন্য ইলিশ আইনেন। রাতে আম্মাকে ইলিশ দিয়ে ভাত খাওয়াবো। মাগরিবে আম্মার জানাজা হলো।
এখন—আমাদের বাসায় ইলিশ আসে, কিন্তু আমাদের আম্মা আর আসে না।
আম্মার খুউব পেট ব্যাথা হলে যে বালিশ টা পেটে চেপে ধরে ঘুমাতো, সেই বালিশটা থেকে আমি একটি প্যাচপেচে মালিশের তেলের গন্ধ পাই। আম্মা পেটে যে তেলটা মালিশ করতেন এটি—সেটিরই গন্ধ। আমি বালিশটা না ধুয়ে রেখে দিছি আলমারিতে। সময়ে-অসময়ে বের করে আমার পেটের সাথে লাগিয়ে রাখি। আম্মার গায়ের ঘ্রাণ পাই। জান্নাতি ঘ্রাণ।
আমার আম্মা—আমি যেন দম আটকে মরে না যাই তার জন্য কত কিছু রেখে গেছে। আমি এখনো তাই বেঁচে আছি। হাপিয়ে পড়ি না এক মুহূর্তের জন্যেও।
আম্মা, দেখেন—
আপনার বড়কন্যা কত নরম। শিমুল তুলার মতো নরম। তুলতুলে। আপনারে নিয়া কিরকম মিঠাগদ্য লিখে। আপনাকে কদমবুসি, আম্মা।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন