রাত্তির দুটার নাগাদ৷ হঠাৎ বিছানার পাশে রাখা মোবাইল ফোনটি বেজে উঠল। গভীর ঘুম। ২য়বার আবার বাজলো। চোখ কচলাতে কচলাতে ফোনটি তুললাম। কানে দেয়ার পর, ওপাশ থেকে শুনতে পেলাম "ভাইয়া মা'র শরীরটা ভালো নাহ। রাত থেইকা খালি তোর কথা কইতেছে। তোরে অনেকবার কল দিছি, তুই ধরস নাই, ভাইয়া এই নে ধর মার সাথে কথা বল।
আমি উঠে বসলাম৷ হঠাৎ করে কিছুই বুঝে উঠতে পারছিনাহ।
হ্যালো মা!
বাবা! তুই কেমন আছিস? বাড়ি আসবি কবে? তোর টাহা পয়সা লাগবো নাহ। তুই বাড়ি চলে আয়। মার লগে থাকবি। ডাইল ভাত খাইয়া বাচুম।
মা! ও- মা! আমি ভালা আছি। তুমার কি হইছে? জ্বর?
নারে বাপ! আমার তোরে দেহোনের অসুখ হইছে৷
মা! দেশের এই পরিস্থিতি। সব লকডাউন। গাড়ি ঘোড়া কিছু চলে নাহ। চাকরীও বন্ধ মা। ক্যামনে যাই৷ আমিও যে ভালা নাই মা! তোমারে সেই কবে দেখছি, তখন কী শীত ছিলো। এহন উত্তপ্ত গরম মা।
তুই ভালা থাক বাপ! সাবধানে থাক।
আমার মনে হলো মা আচল দিয়ে চোখ মুছছে। আমার মায়ের অশ্রুসিক্ত নয়ন।
মা'র নাকি গত দুদিন ধরে শুকনো কাশি। বোনকে জিঙ্গেস করলাম, গলাব্যথা, জ্বর আছে কি না? ও বলল - না ভাইয়া এসব নাই। যাক দুশ্চিন্তা নামল করোনা হয়নাই। ভাই সুযোগ পেলেই চলে আসব। বোনকে বুঝিয়ে ফোনটা রাখলাম।
ওয়াশ রুমে গিয়ে চোখে-মুখে পানি দিলাম৷ রুমে বাতি জ্বলছে দেখে রুমমেট সজীব একবার উঠল। তারপর আবার ঘুমিয়ে পড়ল। ব্যাটা এক ছিচকাদুনির সাথে প্রেম করে। সারারাত ফোনে কথা বলে, আর আফিস গিয়ে ঘুমায়।
সজীব আমার কলিগ। আমি রায়হান। একটা এনজিও তে চাকরি করি। আমার বাবা অল্প বয়সে মারা যায়।
সংসার বলতে আমি, মা আর বোন সুফিয়া। বাবার চলে যাওয়ার পর থেকে সংসার এর হাল বইতে হলো আমাকেই। মামার বাড়ি থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছি। তারপর আর মামার ও সামার্থ্য ছিলোনা পড়ানোর। আসলে কথায় আছে নাহ "অভাগা যেদিকে যায় সাগর শুকিয়ে যায়" আমার হলো ওই দশা।
ব্যাগ-পত্র গুছিয়ে রওনা হলাম, লক্ষীপুর। মায়ের কাছে। মা আর সুফিয়া থাকে লক্ষীপুর নানার বাড়িতে। তাদেরও অভাবের সংসার। ছোট মামা সংসার চালায়৷ দিন আনে দিন খায়, এমন করেই চলছিলো। এখন নতুন করে গিয়ে জুটলাম আমি। ভাবছি কি করা যায়।
সবে এইট পাশ করলাম, কিছু করতে চাওয়া মানে লেখাপড়া টা ছেড়ে দেয়া। কিন্তু লেখাপড়া করে বড় হওয়ার স্বপ্ন বুনছি প্রতিদিন, অন্যদিকে এই অভাব চোখে সইছে নাহ।
দিন যাচ্ছে, সংসারে খরচ - ও বাড়ছে৷ মা-ও অভাবের তাড়নায় ক্রমাগত অসুস্থ হয়ে পড়ছে।
একদিন জুমা বার। মসজিদে নামাজ আদায় করতে গেলাম। নামাজ শেষে বসে আছি। তাসবিহ পড়ছিলাম আপন মনে। এমনি পাড়ার একজন চাচা এসে পাশে বসল। আমি সালাম দিলাম। উনি বলল, বাবা কেমন আছো? মামার বাড়ি থেইকা আসলা কবে ? অামি বললাম এইতো চাচা কয়েকদিন হলো।
চাচা বলেন, তো বাবা এহন কি করো?
ক্লাস এইট পাশ করে নাইনে উঠছি। এহন এখানে স্কুলে ভর্তি হমু৷ কিন্তু টাহা পয়সা নাই ক্যামনে যে কি করমু চাচা!
চাচা কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, তো বাবা তুমি অংক ক্যামন বুঝো?
আমি বললাম, বুঝি চাচা, মানানসই।
চাচা বলেন; তুমি এক কাম করো আমার বাড়িতে লজিং থাকো। আমার দুইডা পোলা আছে, ফাইভে পড়ে, আর একটা মাইয়া আছে ক্লাস সেভেন এইবার।
তুমি ওদেরকে পড়াবা, সাথে নিজেও পড়বা। তোমার লেখাপড়ার খরচ আমিই চালামু।
আমি চাচার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি। মনে হলো ঈশ্বরের পাঠানো কোনো দূত কথা বলছেন। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলি। বললাম ঠিক আছে চাচা; আমি আইজ সন্ধ্যায় আপনাকে জানামু। এহন তাইলে আসি। আসসালামুআলাইকুম....

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন