কে গাউছে পাক?
কে মুহিউদ্দীন?
কে সুলতানুল আউলিয়া?
কে গাউছুল আযম?
এই প্রশ্নের উত্তর জানে না এমন লোক খুঁজে পাওয়া আমাদের জন্য দুষ্কর।
তিনি হলেন হযরত শাইখ আব্দুল কাদির আল-জিলানী আল-হাসানী ওয়াল-হুসাইনী।
সংকলনকারীর সাথে একমত পোষণ করে বলতে পারি 'তাসাউফ নিয়ে পড়াশোনা করছেন বা সুফিজম নিয়ে ধারণা রাখেন, তারা ছাড়াও সাধারণ মুসলমানদের কাছেও গাউসুল আযম পরিচিত এবং ঘনিষ্ঠ।
হযরত গাউছুল আযম কেবলমাত্র একজন শীর্ষস্থানীয় সুফিসাধকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একাধারে আইনজ্ঞ, শাস্ত্রবিধ, ধর্মবেত্তা, দার্শনিক অসাধারণ বাগ্মী ও সুসাহিত্যিক।
"বাংলা সাহিত্যে গাউছে পাক প্রসঙ্গ" তরুণ গবেষক মোহাম্মদ আবু সাঈদের দ্বিতীয় সংকলন এটি। আমরা জানি জলের তলায় ডুব দিয়ে যারা কাজ করে তাদের ডুবুরী বলা হয়।
সিন্ধু সেঁচে মুক্তা আনুক আর নাইবা আনুক একজন ডুবুরী কি পরিমাণ কষ্ট করে এবং কি পরিমাণ আত্মত্যাগ করে সেটা প্রত্যক্ষ সাক্ষী না হলে হয়তো বিশ্বাস করা যাবে না। এই কথাগুলো একজন গবেষকের জন্যও বিবেচ্য বলে বোধ করি।
বইটির প্রতিটি পাতা স্পর্শ করলে বুঝতে পারবেন এখানে গবেষক মোটোমুটি ডুবুরী হিসেবেই জলে নেমেছেন। তবে সিন্ধু সেঁচে কতটুকু মুক্তা কুড়িয়ে আনতে পেরেছেন সেটা একজন বিচক্ষণ পাঠকই উত্তর দিতে পারবেন।
একজন পাঠকের কাছে বইয়ের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ভূমিকাটি গোটা বইয়ের একটি প্রতিচ্ছবি। বেশ সময় নিয়ে পড়েছি। যা মনে হলো মোটাদাগে কয়েকটা বিষয় তুলে আনতে চেয়েছেন গবেষক। কিছু ইঙ্গিত দিয়েছেন যা একটা "গ্রুপ অফ মেস্বার" দের জন্য তোজোদীপ্ত মেসেজ হতে পারে।
যেমন-. বাংলায় আদর্শবান ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তি হিসেবে গাউছে পাকের চর্চা হয়েছে খুব কম।. চর্চা যাই হয়েছে সেটিও ভক্তিবাদে পর্যবসিত, আর্দশ নিয়ে কোনো কাজ নেই।. সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে গাউসে পাককে পাঠ করা।. এক জুলুমবিরোধী গাউছে পাক।
ভুমিকাটি পড়তে গিয়ে একটা ঘটনা মনে পড়ল।
কোথাও একটা পড়েছিলাম ঘটনাটির সূত্র মনে নেই।
নব্বই দশকের শেষের দিকে, শিল্পী আব্বাসউদ্দিনের যােগ্য উত্তরসূরী জনাব আব্বাসী কোনো এক সেমিনারে সঙ্গীত তাসাউফের বিষয়ে কিছু বলছিলেন। বলতে বলতে বলেন, তােমরা যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ো তাদের উচিৎ আমাদের সূফিসাধকদের মূল্যায়ন করা। আমি ইরাকে গিয়ে এক টেক্সি ড্রাইভারকে, হজরত আব্দুল কাদের জিলানীর মাজারে নিয়ে যেতে বললাম, সে তা চিনে না বলে উত্তর দিলো। আমি নাছােড় বান্দা হয়ে এক বয়স্ক ড্রাইভারের কাছে যাই এবং তাকে জিঙ্গেস করি, তখন ঐ বৃদ্ধ ড্রাইভার বলেন -গিলানি গিলানি হাঁ চিন্তে পেরেছি। আমাদের যুব সমাজ গিলানিকে ভুলার কারণেই আজকে তাদের অধঃপতন হয়েছে। জনাব আব্বাসী বলেন 'হীনমন্যতার কোন বালাই নেই, আমিও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সূফীদের সাথে সম্পর্কের কারণে আমার কোথাও মর্যাদার কমতি হয়নি বরং বেড়েছে'।
আজকে ছাত্রদের মধ্যে 'আর্দশিক গাউসে পাক' এর চর্চা নেই। তাঁর রুহানিয়াত বিশেষ ব্যক্তিত্ব নিয়ে যত গুনগান, প্রশস্তি হয়, তার ছিটেফোঁটাও 'একজন আদর্শবাদ মানুষ' হিসেবে হয়না।
জুলুম, সহিংসতাপূর্ণ দুনিয়ার বিরুদ্ধে মজলুমদের যে লড়াই কি হতে পারে তার ইশারা কি গাউসে পাক দেন নাই?
বর্তমানে জুলমভরা পৃথিবী ও সহিংসতাপূর্ণ সমাজে একজন মজলুমের আইডল কি গাউসে পাক হতে পারে না?
এইসব জানাতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ে, কলেজে, স্কুলে। মাঠে-ময়দানে। তুলে ধরতে হবে বই পুস্তকে।
যুগ এবং সময় কোন গাউসে পাককে চাইছে, সেই গাউসে পাককে আবিষ্কার করতে হবে। তবেই চর্চার ফল ভোগ করা সম্ভব।
আধুনিক যুগের কায়কোবাদ, মোজাম্মেল হক, ফররুখরা কই? যাদের হাত দিয়ে গাউছে পাক প্রবাহিত হবেন।
বাংলা সাহিত্যর আধুনিক যুগে গাউসে পাককে নিয়ে খুব বেশি লেখা হয়নি তা স্পষ্ট। আর গবেষক বাংলা সাহিত্যে গাউছে পাকের চর্চাকে মুখ্য বিষয় করেই বইটি লিখেছেন। তাও সুস্পষ্ট। শুরুটা আলাওল দিয়ে হলেও হায়াত মামুদ, কায়কোবাদ, মোজাম্মেল হক, মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, ফররুখ আহমদ, রকীব শাহ, সুফিয়া কামাল, সাবির আহমেদ চৌধুরী, মোহাম্মদ মামুনুর রশীদ, আলাউদ্দিন আহমেদদের গাউসে পাক নিয়ে বিচরণ ছিলো অভাবনীয়।
পুরো বইটি পড়ার পর, আমি একজন পাঠক হিসেবে বলতে পারি, কায়কোবাদ, মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ এবং মোহাম্মদ মামুনুর রশিদ উনারদেরকে সাথে নিয়ে গাউসে পাককে জানার প্রবল ইচ্ছা আপনার মধ্যে সৃষ্টি হবে, হবেই। ক্রমানুযায়ী সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ;
. কায়কোবাদ :
উনবিংশ শতাব্দীর বাঙালি মুসলমানের প্রধান পুরুষদের অন্যতম কবি কায়কোবাদ। তিনি সুফিমনাই ছিলেন ; জীবনের আয়ুষ্কাল শেষদিকে পীরের আদেশ আসে গাউছের রচনা নিয়ে কাজ করার। কায়কোবাদ অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে নাকচ হোন কিন্তু পীর বলেন- 'গাউছুল আযমের এই রচনাকার্য শেষ না হওয়া অবধি তোমার আয়ুষ্কাল শেষ হবে না'
পীরের আদেশে শুরু হলো নতুন যাত্রা। কি অসহনীয় পরিশ্রম করে গাউছে পাকের জীবনী রচনা করেছেন তা বুঝানো মুশকিল। 'ক্ষীণ দৃষ্টিশক্তি, অসুস্থ দেহ, নিস্তেজ প্রাণ' এই নিয়েই শেষ করেন গাউছের জীবনী রচনা। গাউছে পাকের কাব্যজীবনী রচনা করার দায়িত্ব কবির অন্তিমলগ্নে জীবনে কতটা প্রভাব ফেলেছে এবং তাঁর প্রতি কি গভীর প্রেম পুরো পাঠেই আন্দাজ করতে পারবেন।
.মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ:
পুরো বইটিতে সবকজনের মধ্যে তাঁকে একজন 'জাত গবেষক' হিসেবে মনে হলো । তিনি গাউছে পাককে নিয়ে সংক্ষিপ্ত জীবনী রচনা করেছেন কিন্তু তথ্য দিয়ে মুড়ানো ছিলো তার গবেষণা। নজরকাড়বে সুনির্দিষ্ট তারিখ। বুঝা যায় মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ কতখানি গভীর চর্চায় মাতোয়ারা হয়েছিলেন। আর গবেষক তা খুব যত্নের সাথে উদ্ধার করেছেন।
. মোহাম্মদ মামুনুর রশীদ:
আমার মতে পাঠক হিসেবে তাঁকে নিয়ে আফসোস এর শেষ নেই। কালগর্ভে হারিয়ে যাওয়া একজন। সঠিকভাবে পাঠকের দ্বারে কদর পাননি তিনি। গাউছে পাককে নিয়ে তাঁর ' জীলান সূর্যের হাতছানি ' পড়লে বুঝতে পারবেন কি ছিলো তার কোমল উপস্থাপন, আর কত রুপময় ছিলো তার বলার ভঙ্গীমা। তবে আমাদের গবেষক মোহাম্মদ আবু সাঈদের মাধ্যমে জানতে পারবেন মোহাম্মদ মামুনুর রশীদের চর্চার সার-সংক্ষেপ।
গাউছে পাকের দেহাবয়ব বর্ননা এতো শিল্পের মিশ্রনে পূর্বে কেউ করছে কি না আমার জানা নেই।
তিনি লিখেন: "হজরত বড়পীর র. ছিলেন সৌম্যকান্তি সুদর্শন পুরুষ। তাঁর শরীরের রং ছিলো উজ্জ্বল। মধ্যমাকৃতির ছিলেন তিনি। বক্ষ ছিলাে প্রশস্ত। শরীর কৃশকায় হলেও তাঁর সমস্ত অবয়বে ছিল প্রখর ব্যক্তিত্ব্যঞ্জক অভিব্যক্তি। কণ্ঠস্বর গম্ভীর, সুস্পষ্ট ও সুমধুর। প্রশান্ত ললাট। ক্ষীণ ভ্রুরেখা সংলগ্ন। দাঁড়ি মােবারক অত্যন্ত ঘন।
স্বভাব গাম্ভীর্যমণ্ডিত। নীরবতা ও নির্জনতা ভালবাসতেন তিনি।”
কি চমৎকার বিশ্লেষণ। সাত-সমুদ্র তেরো নদী ভ্রমণে যে সুখ পাওয়া যায় তা হয়তো গাউছে পাক নিয়ে লেখা মোহাম্মদ মামুনুর রশীদ এর উক্তিগুলোতে পাবেন। পুরো অংশটাই উজাড় করা হাওয়ার মতো মনে হবে।
সাথে রয়েছে কাসিদায়ে গাউসিয়া: বাংলায় কাব্যানুবাদ।
আমার মতে একজন 'গাউছে পাক' পাঠকের জন্য গোটা বইটাই সারপ্রাইজ। গবেষককে নিয়ে সমালোচনা করার জায়গাটার ফ্লোর নেই। কারণ, শূন্যস্থানগুলো কেবল পূরণ হচ্ছে, তাকে সাধুবাদ জানানোটাই উত্তম বলে বোধ করি। আমি বিশ্বাস করি, গাউছে পাকের বিচরণ হাজার হাজার কেতাবে লিখলেও পাঠকের তৃপ্তি মজবে না, গবেষকের ও কালি ফুরাবে না। তবে মোহাম্মাদ আবু সাঈদ আপ্রাণ চেষ্টা করেছে "বাংলায় গাউছে পাক নিয়ে চর্চার সার-সংক্ষেপ" তুলে আনতে। গবেষকের চেষ্টাটা ডুবুরী সিন্ধু সেঁচে মুক্তা আনার মতোই। আমার মনে হয় আমাদের পাঠক সমাজ এই বিষয়ে মহৎ একটি ধারণা পাবে। পূর্বে, যা অন্তরচক্ষু দূরে থাক চর্মচক্ষুতেও ধরা পরে নি সেইসবও ধরা পড়বে।
"বাংলা সাহিত্যে গাউছে পাক প্রসঙ্গ" বইটির সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ। নিশ্চিতভাবে এই সৃষ্টি পাঠকসমাজে কড়া নাড়বে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন