অনেকদিন বাদে রাত্রিরে বেশ ভালোই ঘুম হলো৷ নিশ্চিন্ত মস্তিষ্কের ঘুম। দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকালাম, সময় ৫ঃ৪৫। বিছানা ছেড়ে উঠে বসলাম৷ মা'কে খুব মনে পড়ছে৷ না জানি কি করছে৷ আসার সময় দেখে এসেছি মায়ের চোখ দুটো ছলছল, একফোঁটা অশ্রুপাত হয়নি৷ তবে কি মায়ের অশ্রুবিসর্জন আমার অনুপস্থিতিতে হয়৷
মা'গো তোমাকে ভীষন মনে পড়ছে।
পাখির শব্দ। স্রষ্টার অদ্ভুত সৃষ্টি। রোজ সকালে মানুষের ঘুম ভাঙ্গানো এদের কাজ৷ খিটখিটে শব্দ নয়, মধুমাখা শব্দ। কানে সুড়সুড়ি দিয়ে জাগিয়ে তোলে। অলস সকাল-ও সক্রিয় হয়৷
জানালার ঘা ঘেঁসে অাসছে সুরভী সুভাস৷ এই বাড়ির সব কিছুই অামাকে মুগ্ধ করছে৷ অাচমকা দরজায় ঠকঠক শব্দ৷ রাফির অাগমন৷ উচ্চস্বরে বলছে 'স্যার বাবা ডাকছে, নাস্তা করার জন্য৷
অামি গিয়ে দরজাটা খুললাম।
রাফিঃ স্যার বাবা অপেক্ষা করছে অাপনার জন্য। অাসেন৷
অামিঃ তুমি যাও৷ স্যার অাসছি৷
অাব্বা মারা যাওয়ার পর অার পরিবারকে নিয়ে একসাথে বসে নাস্তা করা হয়নি৷ খুব টানাটানির সংসার ছিলো৷ সে এক অন্য পরিক্রমা।
অান্টি টেবিলে নাস্তা দিলেন। উর্মি-ও এগিয়ে দিচ্ছে থালা৷ মার নেউটা বলে কথা৷ খুব নাজুক অবস্থা অামার৷
খেতে খেতে চাচা জিঙ্গেস করলেন; কাল রাতে কেমন ঘুম হলো?
অামি খাবার মুখেই মাথা নেড়ে জবাব দিলাম জ্বী চাচা বেশ ভালো৷
অান্টি রান্নাঘর থেকে বলছে শোনো তোমার কোনো অসুবিধা হলে অামাকে বলবে।
পাশ থেকে রাফিও বলে উঠল স্যার অামাকেও বইলেন৷
অামি মৃদুস্বরে হাসলাম৷ চোখ উঠাতেই দেখলাম অাড়চোখে উর্মির দৃষ্টি৷ অামি রীতিমতো সংকোচিত হলাম। অামার কথা যদি বলি ছিপছিপে গড়নের সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ করা, লোকে দেখলেই বুঝে যায় চরানচলে অভাব অনটন পরিবারের বড় ছেলে৷ যার মস্তিষ্কে পাহাড়সম দায়িত্ব।
নাস্তাপর্ব শেষ। সকাল নয়টার নাগাদ দরজার ওপাশে রাফি অার অারফান।
স্যার অাসবো?
হ্যা হ্যা অাসো৷
ওরা পড়তে এসেছে। অামি পড়ানো শুরু করলাম। রাফি যথারিতি অস্থিরতাভাব প্রকাশ করছে।
অামি রাফিকে জিঙ্গেস করলাম উর্মি কোথাই? পড়বে না?
রাফির ছটফটা উত্তর; স্যার অাপুর স্কুল সকাল ৮টা থেকে।
ওহ ; অাচ্চা পড় তোমরা৷ ।
ওদের বাড়ির গেইটের ভিতরে বিশাল বহর জায়গা৷ একপাশে একটি পুকুরঘাট অাছে। দিনের বেলায় বাড়িটা বেশ রমরম শব্দে পরিপূর্ণতা পায়। বাড়ির উঠোন থেকে পুকুরঘাট অবিরাম চলছে ফিসফিস শব্দ৷ ফিসফিস এই শব্দটা একান্তই স্ত্রীবাচকের দখলে। এতে অামাদের নাক না ডুবানোই ভালো। অামরাতো চায়ে বিস্কুট ডুবিয়ে খেতে গিয়ে, বিস্কুট ও গলে গিয়ে ডুবে যায়।
রমনীদের চলার শব্দ, কিশোরিদের নূপুরের ছন্দ, নিশব্দে ফেলে যাওয়া নিঃশ্বাস ক্রমেই জোড়ালো হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে পুরো বাড়িতে, অার গড়িয়ে পরি অামি।
দরজার ফুটে দিয়ে দেখি বাইরে কেউ অাছে কিনা? সেই সকাল ১১টা থেকে দেখি অাসছি কেউ না থাকলেই টুক করে বেরিয়ে গোসল করে অাসব৷ এই বাড়ির সবাই অামাকে বেশ অাপন করে নিয়েছে৷ পুরো বাড়িজুড়েই অামার তোষামোদ চলে। পুকুরঘাট থেকে রসুইঘর একটাই কথা এই বাড়িতে লজিং অাসছে৷
অামার বিরুদ্ধে কারোর কোনো অভিযোগ নেই। গা গমগম করে অাপ্যায়ন চলছে।
এমনি হঠাৎ খেয়াল করলাম গেইট দিয়ে উর্মি ডুকছে। অাঙ্গুলের ইশারায় অামি ডাক দিলাম ;
উর্মি সামনে অাসলো। অামি বলছি; অনেকক্ষণ ধরেই বেরুতে চেষ্টা করছি গোসল করার জন্য, কিন্তু এতো মেয়ে বাইরে অামার প্রচন্ড ইতস্তত বোধ হচ্ছে।
উর্মি একটু মুচকি হেসে বলছে, স্যার অাপনি অামার সাথে অাসেন।
অামি এইরকম ভুবন ডাঙ্গার নিঃশব্দ হাসি অাগে কখনো দেখিনি। শব্দহীন বয়ে যাওয়া উল্লাস এটি।
যোহরের অাজান হলো৷ অামি নামাজ পড়া শেষ করলাম৷ বিছানায় শুয়ে অাছি, মাথার পাশে রাখা শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর রক্তকরবী৷ এই নন্দিনী কে অামি বড়ো ভালোবাসি৷ অামার প্রিয় ফুল রক্তজবা।
দুপুরে সবাই একসাথে খেতে বসেছি৷ চাচা রুম মাছের বড় মাথাটা অামার পাতে তুলে দিলেন। অামি চামচে হাত ঠেকেয়ি না নিতে চাইলাম৷
তারপর অান্টি জোর করে পাতে তুলে দিলেন৷ রাফি খাবার নিয়ে নানারকম বায়না করছে।
উর্মি পাশে বসে খাইয়ে দিচ্ছে। অামার খুব সুফিয়ার কথা মনে পড়ছে। অামার অাদুরে বোন৷ কিন্তু কপালপোড়া; জন্ম থেকেই খেটে যাচ্ছে। কি জানি কতদিন রুই মাছের মাথা খায় না সুফিয়া?
পড়ন্ত সূর্যের ডুবে যাওয়া, গোধুলির অবসর। এই সময় পুকুরঘাটটি খালি থাকে। তাই এটাই উপযুক্ত সময় অামার বসে অবসর কাটানোর৷ অামি এখনো যাদের অাপন ভেবে নিয়েছি তাদের মধ্যে এই পুকুরটিই অন্যতম।
অাপন মনে নীরব কথাগুলো বলি তার সাথে। বয়ে যাওয়া কথোপকথ, কতশত পংক্তিমালা।
অারফান এর কাছ থেকে শুনেছি এই পুকুরঘাটে নাকি পরীরা অাসে। পুকুরে নামে, ঘা বিজিয়ে নেয়।
তবে অামি এখনো এরম অাগন্তুক দৃশ্য দেখিনি। পরীরা বোধহয় বেশ সুন্দর হয়, অামার মায়ের মতো।
অামার মা; গাড় কৃষ্ঞবর্ন, হরিণের মতো চোখ, কখনো কাজল পড়েনি, দৃষ্টিতে অগ্নির ছোঁয়া, গড়পড়তার এই জীবনে হতাশা, বেদনা, তবু-ও বাচবার লড়াই৷ অামার পরী তবে অামার মা!
চলবে............

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন