ইংরেজিতে একটি কথা প্রচলিত আছে ‘Behind every successful man there is a woman’
এই কথাটি পরীক্ষিত এবং প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু ইতিহাসে এমনও একজন আছেন, যিনি তাঁর জীবনের সফলতার জন্য তিনজনকে সর্বদা স্মরণ রেখেছেন। প্রথম মহিলা তাঁকে ধোকা দিয়ে শিক্ষা দিয়েছে, দ্বিতীয় মহিলা ফিক্বহ শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং তৃতীয় মহিলা সারারাত জাগরণ করে ইবাদতে উৎসাহিত করেছেন।
প্রথম মহিলা সমন্ধে এই মনীষী বলেন, “একদিন এক মহিলাকে দেখলাম রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে চোখের ইশারায় কি যেন বলছিল। আমি মনে করলাম সে হয়তো বোবা। এগিয়ে গেলাম তাকে সাহায্য করতে। কিন্তু সে আমাকে রাস্তার একটি বস্তুর দিকে ইঙ্গিত করছিল। ইশারায় সে বুঝাতে চেয়েছিল যে, তার কোন জিনিস পড়ে গিয়েছে, আমি যেন তাকে তা তুলে এনে দিই। আমিও তা তুলে এনে তার সামনে ধরলাম। আমি যখনই তাকে দিতে গেলাম সেই মহিলাটি বলে বসল, “এটা আপনি রাখুন। এটার মালিক এসে আপনার নিকট থেকে নিয়ে যাবে।” বস্তুতঃ সেটা ছিল লুক্বতাহ্' (কুঁড়িয়ে পাওয়া বস্তু)। (গাউসিয়া তরবিয়াতী নেসাব,পৃষ্ঠা-৬৩০)
দ্বিতীয় মহিলার ব্যাপারে তিনি বলেন, “একবার আমি ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে পাঠদান করছিলাম। আমাদের মজলিস ছিল বিশিষ্ট ফকিহ হাম্মাদ ইবনু সুলাইমানের মজলিসের কাছাকাছি। এ সময় এক মহিলা এসে জিজ্ঞাস করলেন, যদি কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে সুন্নাহ পদ্ধতিতে তালাক দিতে চায়, তবে কীভাবে দিবে? আমি বললাম, “আপনি এই মাসআলাটি ইমাম হাম্মাদকে জিজ্ঞাস করুন। তিনি উত্তর দিলে দয়া করে আমাকেও জানাবেন।
মহিলাটা ঠিক ঠিক হাম্মাদ থেকে মাসআলা জেনে আমাকে বলল, হাম্মাদ বললেন, “তালাকের সুন্নাহ পদ্ধতি হচ্ছে, স্বামী তার স্ত্রীকে সঙ্গম ও ঋতুস্রাব অতিবাহিত করবে। তিন ঋতুস্রাব অন্তর্বতী সময়ে স্বামী থেকে বিচ্ছিন্ন থাকবে। তৃতীয় ঋতুস্রাব থেকে পবিত্র হওয়ার পর তাদের পূর্ণ বিচ্ছেদ ঘটবে এবং স্ত্রী অন্যন্ত্র বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার অনুমতি পাবে।”
মহিলা থেকে এই জবাব শুনে আমি বললাম, “ধর্মতত্ত্ব বাদ দিয়ে এইবার আমাকে ফিকহের জ্ঞান অর্জন করতে হবে। এই বলে আমি তাৎক্ষণাৎ জুতো জোড়া সঙ্গে করে ইমাম হাম্মাদের নিকট উপস্থিত হলাম। প্রতিদিন খুব মনোযোগ-সহকারে তার দরস শুনতাম। দরস শেষে ভালোভাবে সেটা রপ্ত করে নিতাম।”(আল খাইরাতুল হিসান, ইবনে হাজার হাইতামি, পৃষ্ঠা-২৫)
তৃতীয় মহিলার ব্যাপারে তিনি বলেন, “একদিন এক নারী আমার দিকে ইঙ্গিত করে তার সঙ্গীনীদেরকে বলছিল, “ইনি হলেন এমন ইবাদত পরায়ণ ব্যক্তি, যিনি সারারাত আল্লাহর ইবাদত করেন।” এই কথাশুনে আমি হতচকিয়ে গেলাম। কেননা, এই কথা সম্পূর্ণ সত্য না। অথচ, আমি তখনো রাতের একটা অংশ ঘুমাতাম। তখন থেকে আমি ভাবলাম আমাকে সারারাত জাগতে হবে, যাতে মুসলমানদের ধারণা সঠিক প্রমাণিত হয়।” শ্রুত আছে যে, দীর্ঘ ৪০ বছর যাবৎ এশার নামাযের ওযু দিয়ে ফজরের নামায সস্পন্ন করেছেন।
তাঁর রাত জেগে ইবাদত সমন্ধে মিসআর ইবনু কিদাম বলেন, একদিন আমি দেখি যে তিনি ফজরের পর থেকে যোহর পর্যন্ত টানা দরস দান করেন। যোহরের এবং মাগরিবের পর থেকে যথারীতি ইশা পর্যন্ত। এভাবে সারা দিন। আমি মনে মনে ভাবি, এই লোকটা যদি সারা দিন এভাবে দরস দানে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে ইবাদত করেন কখন? আজ আমাকে তাঁর ইবাদতের অবস্থা দেখতেই হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী আমি তাঁর সম্পূর্ণ অগোচরে থেকে তাকে লক্ষ্য করতে থাকি। এশার সালাতের পর সবাই ঘরে ফিরে গেলে, তিনি মসজিদে প্রবেশ করেন। মসজিদ তার ঘরের পাশেই ছিল। তিনিই এ মসজিদে ইমামতি করতেন। রাতে সালাত আদায়ের জন্য তাঁর বিশেষ পোশাক ছিল। সেটা পরিধান করে মসজিদে প্রবেশের পর সোজা সালাতে দাঁড়িয়ে যান। এভাবে ফজর পর্যন্ত সালাত আদায় করতে থাকেন। অতঃপর ঘরে প্রবেশ করে পোশাক পরিবর্তন করেন। ফজরের পর সেই আগের মতোই চলতে থাকে। আমিও তাকে প্রতিদিন লক্ষ্য করতে থাকি এবং বরাবরের মতোই তাঁকে দিনে সাওম পালন, দরস প্রদান এবং রাতে সালাত ও তিলাওয়াতে নিমগ্ন থাকতে দেখি। কখনো এর ব্যতিক্রম হতে দেখিনি। অবশ্য ক্লান্তি দূর করার জন্য শুধু যোহরের আগে সামান্য বিশ্রামে যেতেন। (ইশারাতুল মারাম মিন ইবারাতিল ইমাম, কাজি কামালুদ্দিন বায়াযি, পৃষ্ঠা-১৫।)
উপর্যুক্ত ঘটনাটগুলো আমাদের পরিচিত না হলেও, যাঁর সাথে এইসব ঘটেছিল তিনি আমাদের অতি পরিচিত এবং যুগে যুগে প্রত্যেকের জন্য তিনি ছিলেন আলো। যে আলো দিয়ে কেউ তার ঘর আলোকিত করেছে, কেউ খুঁজে পেয়েছে সহজ-সরল পথ। মহান প্রভুর ভাষায় ‘সিরাতাল মুস্তাকিম’। এই আলো আর কেউ নন, জ্ঞানীরা যাঁকে এক বাক্যে ডেকে থাকেন ‘সিরাজুল উম্মাহ(উম্মতের প্রদীপ)’। আর আমাদের মতো সাধারণরা তাকে ডাকে ‘ইমামে আজম’। হ্যাঁ, তিনিই হলেন, হজরত নুমান ইবনে সাবিত। আবু হানিফা উপনামেই যিনি সর্বাধিক খ্যাত। কেনই বা তাঁর এই সকল গুণাবলী থাকবে না, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়ায়সাল্লাম যে বলেছেন, “যদি ইলম সুরাইয়া নক্ষত্রের সমপরিমাণ উচ্চতায় পৌছে যায়, তবে পারস্যের যুবকদের অন্যতম এক যুবক সেখানেও পৌঁছে যাবে (অর্থাৎ ওই জ্ঞান সেখান থেকে আহরণ করে নিয়ে আসবে)।” হাদিসে পাকটি হজরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বর্ণনা করেন। হজরত আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ুতী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি আবু নুআয়মের প্রসিদ্ধ কিতাব ‘হুলিয়া’তে এটি উল্লেখ করেন। নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, ইমাম সুয়ুতী বলেছেন যে, এ হাদিস শরিফে হুযূর সাল্লাল্লাহু তাআলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম যেই মহান ব্যক্তির দিকে ইঙ্গিত করেছেন তিনি হলেন, ইমামে আজম হজরত আবু হানিফা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু। অনুরূপ সায়্যিদুনা হজরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “আমি তোমাদেরকে কুফা নগরীর এমন এক ব্যক্তির কথা বলছি, যার উপনাম হবে আবু হানিফা, তাঁর হৃদয় হবে ইলম ও হিকমতের সমুদ্র, তাঁর কারণে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর উম্মত ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে যাবে। কিন্তু কিছু লোক তাঁর প্রতি বিদ্বেষভাব পোষণ করবে।”
জীবনের প্রথম ইমামে আজম ছিলেন ইলমে কালামের একজন দক্ষ ব্যক্তি। ভাষার দক্ষতায় নাস্তিকদের কুপকাত করতে তাঁর কোনো জুরি ছিল না। একবার এক নাস্তিক ইমামে আজম থেকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার খোদা কোথায় থাকে?” ইমামে আজম বললেন, “তুমি এক গ্লাস দুধ নিয়ে এসো।” নাস্তিক দৌঁড়ে গেল, দুধ নিয়ে ফেরত আসলো। ইমামে আজম বললেন-
-বল এর মধ্যে মাখন কোথায় থাকে?
-সব খানে।
-যদি মাখনের মত সৃষ্ট বস্তু দুধের সব জায়গায় থাকে তাহলে আল্লাহ কিভাবে একটি স্থা্নে থাকতে পারে? এটা তো বিরট আশ্চর্য!
আরেকদিন আরেক নাস্তিক তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার খোদা কোন দিকে মুখ করে আছেন?”
ইমামে আজম বললেন- যদি কোনো অন্ধকার স্থানে মোমবাতি আনা হয় সেটা কোন দিকে মুখ করে থাকে?
- সব দিকে
- যদি তোমার পার্থিব কৃত্রিম আলো সব দিকে মুখ করে থাকতে পারে, তাহলে যিনি আলো তৈরী করেছেন তিনি কি পারেন না?
আহা! কি জবাব। কি চিত্র। কঠিন থেকে কঠিনতম সমস্যাও হয়ে যায় জলের মতো স্পষ্ট। মাত্র দুটি উল্লেখ করলাম। তার এমন জবাব অগণিত। মঞ্চে বসার পূর্বে আমাদের অবশ্যই বিচক্ষণ হতে হবে। ইমামে আজম দৃঢ়তার সাথে কথা বলতেন। তার প্রতিটি কথা হতো যুক্তিনির্ভর।
বাগ্মী ও সুতার্কিক হওয়া সত্ত্বেও ইলমে ফিকাহ-রত প্রেমে পড়ে তিনি যুক্তিবিদ্যাকে চিরতরে বিদায় জানিয়ে দিয়েছিলেন। মানাকিবে ইমামে আজম কিতাবে উল্লেখ আছে, “ইমামে আ'যম আবু হানিফা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু সর্বপ্রথম ইলমে কালাম(তর্ক শাস্ত্র বা যুক্তিবিদ্যা) শিক্ষা আরম্ভ করেন। এই বিষয়ে পাণ্ডিত্য অর্জনের পর বিভিন্ন বাতিল ফির্কার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হতেন। কিছু দিন এভাবে অতিক্রম হওয়ার পর তিনি চিন্তা করলেন যে, সাহাবায়ে কিরাম দ্বীনি বিষয়ে সর্বোচ্চ জ্ঞানের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তাঁরা আল্লাহ’র সত্তা ও গুণাবলী সম্পর্কে জবরীয়া ও কদরীয়া ইত্যাদি বাতিল ফির্কাদের সাথে বিতর্কে জড়াননি। বরং, এর বিপরীতে শরয়ী ও ফিকহী মাসআলা'র দিকে তাঁদের মনোযোগ ছিল বেশি। আর, ইলমে কালাম যদি এতই গুরুত্বপূর্ণ হতো তাহলে তাঁরাতো কখনো তা পরিত্যাগ করতেন না৷ এই খেয়াল মনে জাগ্রত হওয়ার পর তিনি ইলমে কালাম পরিত্যেগ করে ইলমে হাদিস ও ইলমে ফিকাহের প্রতি মনোনিবেশ করলেন( মানাকিবে ইমামে আজম, খণ্ড-১, ইমাম মুয়াফফিক ইবনে আহমদ মক্কী রাহিমাহুমুল্লাহ, পৃষ্ঠা- ৫৯)
(শরহে মুসনাদে ইমাম আ’যম আবু হানিফা রাদ্বিয়াল্লাহু, হাফেয মওলানা মুহাম্মদ ওসমান গণি, পৃষ্ঠা-১৮।)
গবেষকদের মতে তিনি চল্লিশ হাজার হাদিস থেকে বাছাই করে ‘কিতাবুল আসার’ সংকলন করেছিলেন। তার সবচেয়ে বড় অবদান হলো কোরআন ও হাদিস থেকে জনসাধারণের আমল উপযোগী মাসআলা বের করার মূলনীতি দাঁড় করানো। তার সম্পাদিত এ শাস্ত্রের নাম উসুলুল ফিকহ। এ কাজের জন্যই তিনি ইমামে আজম খ্যাতি লাভ করেন। তার প্রণীত ‘ফিকহ’ আমাদের কাছে ফিকহে হানাফি নামে পরিচিত। তাঁর জীবনের প্রতিটি ধাপ উম্মতে মুহাম্মদির জন্য শিক্ষা। জ্ঞানার্জনের অহর্নিশ ছুটেছেন সর্বত্র। জ্ঞান ধাপগুলোতে রাজত্ব নিয়ে বসে পড়েছিলেন ইলমে তাসাউফের দরসে। যেখানে তিনি সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন, ইমাম জাফর আস-সাদিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু’র। যাঁর দুই বছরের সান্নিধ্যকেই তিনি জীবনের আসল বছর বলে গণনা করতেন। তাঁর যুগে তিনি ছিলেন অতুলনীয়। জ্ঞানে, ইবাদতে কিংবা মিথ্যার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে। সত্যের রাস্তায় সদা অবিচল এই ইমামের শেষ যাত্রা দুনিয়াবি দৃষ্টিতে অতটা সুন্দর কিংবা আড়ম্বর হয়নি। সাইয়্যিদুনা আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর কথা-ই এখানে প্রমাণিত হয়েছে। জালিম বাদশাহর পক্ষে না থাকায় তাঁকে শহিদ করা হয়েছিল নির্মমভাবে। দুনিয়ার চোখে এটি মর্মান্তিক ও ভয়ানক হলেও মুসলিমরাতো জানে শাহাদাতের স্তর কেমন! কতটা তার মর্যাদা! আর ইমামে আজম তো ছিলেন প্রেমিক। আল্লাহর প্রেমের এক অনন্য প্রেমিক। আর মৃত্যু তো সেই প্রভুর মিলনের একমাত্র সেতু। আবার তাও শহিদি মৃত্যু। এইসব জানতেন ইমামে আজমও। তাই আর কী, চলে গেলেন যেভাবে সবাইকে চলে যেতে হয়। চলে গেলেন একটি যুগে বসে পরবর্তী হাজার যুগে রাজত্ব করা এই মহান মনীষী। তবে রেখে গিয়েছেন, তাঁর আদর্শ শিক্ষা এবং জ্ঞান। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ইমামে আজমের মর্যাদা বুঝার এবং সমুন্নত রাখার তৌফিক দান করুন। আমিন।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন